পহেলা ফাল্গুন মানেই শহরের রঙ বদলে যাওয়া। কিন্তু সাবিহার কাছে এই দিনটার মানে একটু আলাদা। তার জন্য এটি কেবল উৎসব নয়-একটা পর্যবেক্ষণের দিন।
সাবিহা চারুকলার ছাত্রী। সে মানুষের ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে মানুষকে দেখতে ভালোবাসে। কে কীভাবে হাসছে, কে কার হাত ধরে হাঁটছে, কে একা বসে আছে-এসব ছোট ছোট দৃশ্য তার খাতায় গল্প হয়ে জমে থাকে।
সকালে সে খুব সাধারণ একটা হলুদ কুর্তি পরে বের হলো। বাড়ির সামনে শিমুল গাছের নিচে কয়েকটা লাল পাপড়ি পড়ে আছে। সে একটা তুলে নিল। পাপড়িটা হাতে নিয়ে মনে হলো, ঋতু বদলানো আসলে খুব নীরব একটা ঘটনা-কেউ ঘোষণা দেয় না, তবু সব বদলে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দিকে যেতে যেতে সে দেখল রাস্তার পাশে ফুল বিক্রেতাদের ভিড়। ছোট ছোট বাচ্চারা মাথায় ফুলের ঝুড়ি নিয়ে হাঁটছে। কেউ পলাশ, কেউ গাঁদা, কেউবা বকুল বিক্রি করছে। সাবিহা থামল। একটা ছোট মেয়ে, বয়স দশের বেশি নয়, হাসিমুখে বলল, “আপু, ফুল নেবেন?”
সাবিহা জিজ্ঞেস করল, “আজ কেমন বিক্রি?’’
মেয়েটা চোখ টিপে বলল, “আজ তো আমাদের ঈদ!’’
সাবিহা একটা ছোট গাঁদার মালা কিনল। গলায় পরল না, হাতে জড়িয়ে রাখল। মেয়েটার হাসিটা তার খাতায় জমা রাখার মতো মনে হলো।
টিএসসি চত্বরে পৌঁছে সে একটা বেঞ্চে বসে পড়ল। চারপাশে ঢোলের তালে গান, কবিতা আবৃত্তি, কেউ রঙ ছিটাচ্ছে, কেউ ছবি তুলছে। কিন্তু এই কোলাহলের মাঝেও সে খেয়াল করল-এক কোণে এক বৃদ্ধ লোক চুপচাপ বসে আছেন। তাঁর হাতে একটা পুরনো ক্যামেরা।
সাবিহা এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “চাচা, ছবি তুলছেন না কেন?’’
লোকটা হেসে বললেন, “আগে তুলতাম। এখন দেখি।”
“দেখেন মানে?’’
“এখন মানুষকে ক্যামেরার ভেতর না রেখে চোখের ভেতর রাখি।”
সাবিহা কথাটা শুনে চুপ করে গেল। সত্যিই তো-সবকিছু কি ছবি হয়ে থাকলেই টিকে থাকে? নাকি স্মৃতিই আসল জায়গা?
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। রোদ নরম হয়ে এলো। সাবিহা খাতাটা বের করল। লিখল-
“পহেলা ফাল্গুন মানে শুধু রঙ নয়। এটা মানুষের মুখে জমে থাকা আলোর দিন। কেউ আজ নতুন শাড়ি পরে, কেউ নতুন স্বপ্ন দেখে, কেউ শুধু ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে বদলে যাওয়া ঋতুকে অনুভব করে।”
হঠাৎ আকাশে এক ঝলক হাওয়া এলো। কয়েকটা শুকনো পাতা উড়ে গেল। তার পাশে বসা এক ছোট ছেলে বলল, “আপু, দেখেন, বসন্ত আসলে নাচতে নাচতে আসে!’’
সাবিহা হেসে ফেলল।
হ্যাঁ, বসন্ত হয়তো সত্যিই নাচতে নাচতে আসে। কিন্তু সে কারও জন্য থেমে থাকে না। সে কেবল মনে করিয়ে দেয়-সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, শহর বদলায়।
সন্ধ্যার আলো নেমে এলে সাবিহা বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল। হাতে এখনও গাঁদার মালাটা। পাপড়িগুলো একটু শুকিয়ে এসেছে, কিন্তু রঙ ফিকে হয়নি।
তার মনে হলো, পহেলা ফাল্গুন আসলে এক দিনের উৎসব নয়। এটা একটা অনুভূতি-যা বলে, জীবন যতই ধূসর হোক, তার ভেতর কোথাও না কোথাও রঙ জমা থাকে।
আর সেই রঙ খুঁজে পাওয়ার জন্য কখনও কখনও শুধু একটা বসন্তের সকালই যথেষ্ট।