কে বলে মোর মাকে কালো, মা যে আমার জ্যোতিমর্তী। কোটি চন্দ্র সূর্য তারা নিত্য করে যার আরতি। কালো রূপের মায়া দিয়ে মহামায়া রয় লুকিয়ে, মায়ের শুভ্ররূপ দেখেছে শুভ্র শুচি যার ভক্তি। যোগীন্দ্র যাঁর চরণ-তলে ধ্যান করে রে যাঁর মহিমা, দু'টি নয়ন-প্রদীপ জ্বেলে খুঁজি সেই অসীমার সীমা। সাজিয়ে কালী গৌরী মাকে পূজা করি তমসাকে, মায়ের শুভ্ররূপ দেখেছে শুভ্র শুচি যার ভক্তি। মাতৃরূপিণী কালীর প্রতি ভক্তি, দর্শন এবং মাতৃপ্রেমের এক অনবদ্য শৈল্পিক প্রকাশ ঘটেছে এ নজরুল সঙ্গীতে। মূলত এই গানের মাধ্যমে কবি আদ্যাশক্তি মহামায়ার বাহ্যিক কালো রূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তাঁর জ্যোতির্ময় সত্তার বন্দনা করেছেন। বাহ্যিক রূপের আড়ালে থাকা শাশ্বত সত্যকে অনুধাবন করা এবং নির্মল ভক্তির মাধ্যমে সেই জ্যোতির্ময় সত্তার উপলব্ধিই এই গানের প্রকৃত উপজীব্য বিষয়। কালীর কালোরূপ দেখে যাঁরা তাঁকে কালো বলেন তাঁদেরকে স্মরণ করিয়ে কবি বলছেন-মাতৃরূপিণী কালী জ্যোতির্ময়ী বলেই-তাঁকে নিত্য আরতি করে চলেছে কোটি কোটি চন্দ্র, সূর্য ও তারা। মূলত মহামায়া রূপিণী এই দেবী তাঁর কালো রূপের মায়া দিয়ে তাঁর জ্যোতির্ময়ী রূপকে লুকিয়ে রেখেছেন। তাঁর প্রকৃত শুভ্র রূপ কেবল তারাই দেখতে পান, যাঁদের ভক্তিতে আছে পবিত্র ও নির্মল নিবেদন। যোগী-ঋষিরা যাঁর চরণতলে জ্ঞানলোকের সন্ধানে ধ্যানমগ্ন থাকেন, সেই জ্ঞানমগ্ন বিদগ্ধ দৃষ্টিতে কবি দেবীর অসীম সীমা অন্বষণ করতে চান। কালো বর্ণের কালী আর এবং উজ্জ্বল শুভ্রবর্ণা গৌরী- উভয় রূপেই দেবী বিরাজ করেন। কবি দেবীর এই দ্বৈত রূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দেবীর প্রকৃত সত্তাকে ভক্তি ভরে পরে পূজা করতে চান। তাই কবির কাছে কালী ও গৌরী উভয় রূপই পূজ্য। এছাড়াও ‘কে বলেছে মা আমার কালো, মা যে আমার বিশ্বজুড়ে জ্বালিয়ে দিল আলো’ এমন বহু ভক্তিমূলক গান কিংবা ছন্দ মন্দিরে আসা ভক্তদের মুখে মুখে প্রচলিত। এসব গাইতে গাইতে শ্রদ্ধা জানিয়ে মায়ের চরণে অঞ্জলি দেন পূজারীরা। এখানে এলে জীবনের দুঃখ মোচন হয়, মনে শান্তি মেলে, এই বিশ্বাস থেকে ভিড় জমান হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষরা। সবুজ বৃক্ষরাজির ছায়াঘেরা পরিবেশ আর এক পাশের খাল যেন তাঁদের ভাবদর্শনকে বহু গুণে শাণিত করে দেয়। প্রায় সাড়ে চারশ' বছরের পুরোনো বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের কোলজুড়ে গৌরনদী উপজেলার বার্থী শ্রীশ্রী তারা মায়ের মন্দিরটি ভক্তদের কাছে দক্ষিণ এশিয়ার মনোমুগ্ধকর ও শৈল্পিক স্থাপনার এক অনন্য নিদর্শন এবং পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত।
জনশ্রুতি রয়েছে, হিমালয় পর্বত কিংবা কানাডা থেকে আসা কোনো এক সন্ন্যাসী মায়ের এ মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রাগৈতিহাসিক যুগে হিমালয় পর্বত থেকে সাধু-সন্ন্যাসীরা আসতেন এখানে। ওইসময় বার্থী গ্রামটি ছিল তীর্থস্থান। আর্য যুগ থেকে বার্থী গ্রাম ছিল ব্রাহ্মণদের আবাসভূমি। সেই যুগে এখানে ৩৬৫টি ঘর ছিল, যেখানে ব্রাহ্মণেরা থাকতেন, ছিল বহু দেব-দেবী। পরবর্তী সময়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে তৎকালীন জমিদার ভূপতিমোহন বকসি মন্দিরটি সংস্কার করেন। এরপর বিভিন্ন সময় মন্দিরটির আধুনিকায়নের কাজ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এ মন্দিরকে কেউ বলেন বার্থী কালীবাড়ি, কেউ বলেন বার্থী তারা মায়ের মন্দির। বার্থী তারা মায়ের মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা খালে একসময় ভরা যৌবন ছিল। ভক্তরা এই খালে স্নান করে বিপদ মুক্তির আশা করতেন। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের সম্প্রসারণের কারণে মন্দিরের কিছু জায়গা রাস্তায় চলে গেছে। বার্থী কালীমন্দির কমপ্লেক্সের আধুনিকায়ন করা হয়েছে। কাজটি করেছেন মন্দির ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি অ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার এবং বিজয় কৃষ্ণ দে। তাঁদের চেষ্টায় মন্দিরটি আরও দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে। মন্দিরের মূর্তিগুলো শ্বেত পাথরের দ্বারা নির্মিত। মন্দির কর্তৃপক্ষ জানায়, মূর্তিগুলো ভারতের জয়পুরের একটি নামকরা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শিল্পীরা এক বছর সময় নিয়ে তৈরি করেছেন। বর্তমানে এখানে তিনজন পুরোহিত রয়েছেন। মন্দিরের বাৎসরিক পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় কুমার পাল বলেন, প্রতিবছরের ন্যায় আগামীকাল শনিবার (২৮ মার্চ) মন্দিরের বাৎসরিক পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে এখানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভক্তরা আসতে শুরু করেছেন। তাছাড়া, ভারত, নেপাল, ভুটানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা প্রতিবছর মায়ের আশীর্বাদ নিতে ছুটে আসেন। তিনি আরও বলেন, বাৎসরিক পূজা উপলক্ষে দিনরাতব্যাপী ব্যাপক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য এম জহির উদ্দিন স্বপন। বাৎসরিক পূজায় মন্দির চত্বরে বিভিন্ন বয়সের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। তাছাড়া বছরের অন্য সময়গুলোয়ও ভক্তদের ভিড় থাকে এখানে। দূর থেকে আসা ভক্তদের জন্য এখানে ‘শান্তিলতা পোদ্দার অঙ্গন’ ও ‘নবদ্বীপ পোদ্দার’ নামে দুটি বিশ্রামাগার রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তারা মায়ের নামানুসারে গৌরনদীতে বার্থী তাঁরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, তাঁরাকুপি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তাঁরাকুপি নামের একটি গ্রাম রয়েছে। পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি পঞ্চানন দত্ত বলেছেন, এবারের বাৎসরিক পূজা উপলক্ষে ২৮ মার্চ (শনিবার) দিবারাত্র ব্যাপক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এরমধ্যে সকাল নয়টায় পূজা আরম্ভ ও চন্ডীপাঠ, দুপুর একটায় বলিদান, সন্ধ্যা ছয়টায় মায়ের সামনে আরতি, রাত ১১ টায় বিশ্ব শান্তিকল্পে প্রার্থনা, রাত ১২ টায় রাতের পূজা ও শিবাভোগ। দুপুর দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা এবং রাতে পূজার পরে চারটা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত প্রসাদ বিতরণ করা হবে।