চট্টগ্রাম নগরীর নিউ মার্কেট এলাকায় নির্মিত ‘৩৬ জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ ঘিরে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং বিব্রতকর। একটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নির্মিত স্থাপনা অল্প সময়ের মধ্যেই অযত্ন, অবহেলা ও অপ্রশাসনের প্রতীক হয়ে উঠবে-এমনটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। বরং এটি আমাদের সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ, নাগরিক সচেতনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণের মূল লক্ষ্য ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করা এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেটি এখন ময়লা-আবর্জনায় ভরা, আগাছায় আচ্ছন্ন এবং অসামাজিক কার্যকলাপের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। এর ফলে শুধু একটি স্থাপনার সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে না; বরং একটি ঐতিহাসিক স্মৃতির মর্যাদাও ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। স্থানীয়দের অনেকে জানেনই না সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে-এটিও পরিকল্পনার ঘাটতির একটি বড় প্রমাণ। এই পরিস্থিতির জন্য এককভাবে কাউকে দায়ী করা কঠিন। সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, রেলওয়ে এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। প্রত্যেক সংস্থা দায়িত্ব অন্যের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে-যা সমস্যার সমাধানকে আরও বিলম্বিত করছে। একই সঙ্গে নাগরিক অসচেতনতা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণও এ অবস্থার জন্য কম দায়ী নয়। যেখানে সেখানে আবর্জনা ফেলা, পাবলিক স্পেসের প্রতি অবহেলা-এসব প্রবণতা আমাদের নগর ব্যবস্থাপনাকে ক্রমেই জটিল করে তুলছে। তবে এ সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়। এক্ষেত্রে স্মৃতিস্তম্ভের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা চিহ্নিত করতে হবে, যাতে জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে এলাকাটিকে সক্রিয় ও নিরাপদ রাখতে হবে। এছাড়াও স্থানীয় জনগণ ও ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি, যাতে তারা নিজেরাও এ ধরনের স্থাপনার প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করেন। এছাড়া, এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি স্মৃতিস্তম্ভকে জনমানবশূন্য ও অদৃশ্য স্থানে সীমাবদ্ধ না রেখে, পরিকল্পিতভাবে দৃশ্যমান ও সহজপ্রবেশযোগ্য স্থানে উন্নয়ন করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ স্মৃতি কমপ্লেক্সে রূপান্তরের কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে, যেখানে ইতিহাস, শিক্ষা ও নাগরিক চেতনার সমন্বয় ঘটবে। একটি স্মৃতিস্তম্ভ শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; এটি একটি জাতির স্মৃতি, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রতীক। তাই এর যথাযথ সংরক্ষণ শুধু প্রশাসনের নয়, আমাদের সবার দায়িত্ব। এখন প্রয়োজন দ্রুত, সমন্বিত এবং টেকসই উদ্যোগ-যাতে ‘৩৬ জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ আবারও তার প্রাপ্য মর্যাদা ফিরে পায়।