রাজশাহীর মাঠজুড়ে এখন বোরো ধান কাটার উৎসবমুখর দৃশ্য। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষকের ব্যস্ততা, কম্বাইন হারভেস্টারের শব্দ আর উঠোনজুড়ে ধান শুকানোর দৃশ্য গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্যেরই প্রতিচ্ছবি। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার জেলায় বোরো ধানের ফলন সন্তোষজনক। আবহাওয়াও অনুকূলে থাকায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশাবাদ রয়েছে। কিন্তু এই আশাবাদের আড়ালেই লুকিয়ে আছে কৃষকের দীর্ঘদিনের পুরোনো সংকট-উৎপাদনের পরও ন্যায্যমূল্য না পাওয়া। বাংলাদেশের কৃষক বরাবরই উৎপাদনের দায়িত্ব পালন করে আসছেন, কিন্তু বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে তার প্রাপ্য লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রাজশাহীর চিকন ধান বা জিরাশাইলের সুনাম দেশজুড়ে থাকলেও এবার সেই ধান চাষ করেই লোকসানের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন কৃষকরা। একদিকে শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরি, অন্যদিকে সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও জমি লিজের খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। অথচ বাজারে ধানের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো-ধানের দাম কম হলেও চালের বাজারে মূল্য কমেনি। এর ফলে প্রশ্ন উঠছে, উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে কারা লাভবান হচ্ছে? কৃষকদের অভিযোগ, মিলার ও আড়তদারদের এক ধরনের অস্বচ্ছ বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। ভরা মৌসুমে কম দামে ধান কিনে পরে বেশি দামে চাল বিক্রির যে অভিযোগ উঠছে, তা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি ধান সংগ্রহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। সরকার প্রতি বছর ধান সংগ্রহ কর্মসূচি চালু করলেও প্রান্তিক কৃষকের বড় অংশ সেখানে অংশ নিতে পারেন না। প্রশাসনিক জটিলতা, পরিবহন ব্যয়, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাজারেই কম দামে ধান বিক্রি করেন। ফলে সরকারি সহায়তার মূল সুবিধা অনেক সময় প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। এ পরিস্থিতি শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতির জন্যও একটি সতর্কবার্তা। ধারাবাহিক লোকসানের কারণে যদি কৃষক কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেন, তবে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে আলু চাষে লোকসানের পর ধানেও ক্ষতির আশঙ্কা কৃষকদের হতাশা আরও বাড়িয়েছে। অতএব, এখন প্রয়োজন কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর বাজার তদারকি, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সরকারি ক্রয় বাড়ানো এবং কৃষি উপকরণের ব্যয় কমাতে বাস্তবসম্মত সহায়তা দেওয়া। কৃষকের ঘরে স্বস্তি না ফিরলে মাঠের সোনালি ধানও জাতীয় অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত সুফল বয়ে আনতে পারবে না।