গেস্টরুমের অন্ধকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হারানো মানবিকতা

এফএনএস | প্রকাশ: ১৩ মে, ২০২৬, ০৩:২৫ পিএম
গেস্টরুমের অন্ধকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হারানো মানবিকতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা, মুক্তবুদ্ধি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীক। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই ক্যাম্পাসে যে সহিংসতা, ভয়ভীতি ও রাজনৈতিক আধিপত্যের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, সাম্প্রতিক নানা তথ্য-উপাত্ত ও ভুক্তভোগীদের বয়ানে তার এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। মনির উদ্দিন, এহসান রফিক কিংবা আবু বকরের মতো শিক্ষার্থীদের করুণ পরিণতি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী নিপীড়নমূলক সংস্কৃতির প্রতিফলন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মতাদর্শিক বিরোধ নতুন কিছু নয়। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতির নামে ভয়ভীতি সৃষ্টি, এমনকি তথাকথিত ‘টর্চার সেল’ পরিচালনার অভিযোগ-এসব কোনো সভ্য শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, বহু শিক্ষার্থী বছরের পর বছর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন; অনেকে শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেননি, কেউ কেউ মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন, আবার কেউ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঘটনায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি দৃশ্যমান ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাময়িক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অভিযুক্তরা প্রভাব-প্রতিপত্তি বজায় রেখেছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, মামলা নিতে অনীহা, চিকিৎসা নথির অভাব এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও জটিল করেছে। ফলে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা শুধু শারীরিক বা মানসিক ক্ষতিই বহন করেননি, বরং রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকাও এ প্রসঙ্গে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অতীতে গেস্টরুম নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার কিংবা গুরুত্বহীন হিসেবে দেখার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ভিন্নমত প্রকাশ বা নিরপেক্ষ অবস্থানও ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা শুধু শিক্ষাঙ্গনের সংকট নয়; গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিরও সংকেতবাহী সংকট। তবে অতীতের এই অন্ধকার অধ্যায় সামনে আসা ইতিবাচকও বটে, কারণ সত্য উন্মোচনই সংস্কারের প্রথম ধাপ। এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবাসন সংকট নিরসন, দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আবারও জ্ঞান, মানবিকতা ও মুক্তচিন্তার নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্যথায়, মনিরদের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন বারবার আমাদের জাতীয় বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই থাকবে।