বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের (এনসিডি) ক্রমবর্ধমান বিস্তার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। হৃদরোগ, ক্যান্সার, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি অসুখের পেছনে তামাক ব্যবহারের ভূমিকা সুস্পষ্ট। এমন বাস্তবতায় তামাক নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসন্ন বাজেটে কার্যকর করারোপ ও মূল্য বৃদ্ধির দাবি বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে উঠে আসা সময়োপযোগী এবং যৌক্তিক। উপস্থাপিত তথ্য বলছে, দেশে তামাক ব্যবহারের হার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে। প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু এবং বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি-এই দুই সূচকই প্রমাণ করে যে তামাক কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। তামাকজনিত ক্ষতির পরিমাণ রাজস্ব আয়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হওয়া এ খাতের নীতিগত দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতা বলে, তামাক ব্যবহার কমাতে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মূল্য বৃদ্ধি। কর বাড়ানোর মাধ্যমে তামাকপণ্যের দাম বাড়ালে তা বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ব্যবহার শুরুর প্রবণতা কমাতে সহায়ক হয়। বাংলাদেশে বিদ্যমান বহুস্তরবিশিষ্ট কর কাঠামো জটিল হওয়ায় ব্যবহারকারীরা সহজেই এক স্তর থেকে অন্য স্তরে সরে গিয়ে ধূমপান চালিয়ে যেতে পারছেন। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না। এ প্রেক্ষাপটে কর কাঠামো সরলীকরণ এবং সুনির্দিষ্ট কর আরোপের প্রস্তাব একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারে। নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একত্র করা, ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ এবং সব স্তরে নির্দিষ্ট কর আরোপ-এসব উদ্যোগ তামাকপণ্যকে তুলনামূলকভাবে কম সাশ্রয়ী করে তুলবে। এর ফলে ব্যবহার কমবে এবং নতুন ব্যবহারকারী সৃষ্টির হারও হ্রাস পাবে। তবে এ ধরনের নীতিমালা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তামাক শিল্পের প্রভাব এবং রাজস্ব নির্ভরতার যুক্তি প্রায়ই কার্যকর সংস্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি এবং চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় নিলে তামাক নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। একই সঙ্গে এ খাতে অর্জিত অতিরিক্ত রাজস্ব জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে বিনিয়োগ করা গেলে তা হবে টেকসই নীতির অংশ। এতে একদিকে যেমন রোগ প্রতিরোধ সম্ভব হবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতাও বাড়বে। তামাক কর বৃদ্ধি কেবল রাজস্ব বাড়ানোর কৌশল নয়; এটি জনস্বাস্থ্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুস্থ ও নিরাপদ জীবন উপহার দেওয়া সম্ভব। এখন প্রয়োজন দৃঢ় নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অঙ্গীকার।