সিনেমার কাহিনী কেও হার মানায়

শিক্ষকের লালসার স্বীকার মেধাবী ছাত্রী, গ্রেপ্তার শিক্ষক

এফএনএস (নাসির উদ্দিন মিরাজ; বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী) : | প্রকাশ: ৯ মে, ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম
শিক্ষকের লালসার স্বীকার মেধাবী ছাত্রী, গ্রেপ্তার শিক্ষক

আগে এমন ঘটনা শুধু সিনেমাতেই দেখা যেত। ভিলেন নায়িকাকে ব্ল্যাকমেইল করছে, গোপন ভিডিও দেখিয়ে টাকা আদায় করছে কিংবা জিম্মি করে নির্যাতন চালাচ্ছে। কিন্তু এবার বাস্তবেই ঘটে গেল এমন এক মর্মান্তিক ঘটনা। আর সেই ঘটনার অভিযোগ উঠেছে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। অভিযোগের তীর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনের দিকে। ভুক্তভোগী  শিক্ষার্থীর পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে ওই ছাত্রীকে ব্ল্যাকমেইল করে শারীরিক নির্যাতন করে আসছিল তিনি।

জানা যায়, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ওই ছাত্রী শহীদ আমান উল্লাহ পাবলিক স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। সে সময় শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন একই প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ভালো ফলাফলের আশায় ওই শিক্ষার্থী প্রাইভেট পড়তে শুরু করে তার কাছে। আর সেই সুযোগই কাজে লাগান অভিযুক্ত শিক্ষক।

পরিবারের অভিযোগ, শিক্ষার্থীর মোবাইল থেকে ব্যক্তিগত কিছু ছবি সংগ্রহ করে শুরু হয় ব্ল্যাকমেইল। পরে ছবি ডিলিট করার কথা বলে তাকে ডেকে নেওয়া হয় শিক্ষক শংকর চন্দ্র মজুমদারের বাড়িতে। সেখানে নিয়ে চালানো হয় শারীরিক নির্যাতন। শুধু তাই নয়, গোপনে ধারণ করা হয় নির্যাতনের ভিডিও। এরপর থেকেই শুরু হয় নতুন করে ব্ল্যাকমেইল। আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ করেছে পরিবার।

এদিকে, কাজিরহাট এম এ হাশেম কলেজের আইসিটি শিক্ষক শহিদ উল্লাহর সাথেও ওই ছাত্রীর সম্পর্ক আছে বলে কথা উঠে। পরে তার বিরুদ্ধে কলেজ আঙিনায় বিক্ষোভ হয়, পরিবারের দাবি, এটি গুজব, এর পেছনেও ছিলেন দেলোয়ার মাস্টার।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পিতা শহীদুল্লাহ জানান, তিনি প্রবাসে থাকায় প্রথমদিকে বিষয়টি জানতে পারেননি। পরে দেশে ফিরে দেলোয়ার হোসেনের সাথে কথা বলতে গেলে উল্টো অপমানিত হতে হয় তাদের। এমনকি গোপন ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। 

ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, ভিডিও ডিলিট করার বিনিময়ে ১২ লাখ টাকা দাবি করে অভিযুক্ত দেলোয়ার মাস্টার। পরে আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে ৩ লাখ টাকা দেওয়া হয় যাতে মেয়েকে আর বিরক্ত না করা হয় এবং ভিডিওগুলো মুছে ফেলা হয়। কিন্তু তাতেও শেষ হয়নি হয়রানি। পরিবারের অভিযোগ, ২০২৫ সালের শেষ দিকে ওই ছাত্রীর বিয়ে হলে দেলোয়ার মাস্টার তার স্বামীর মোবাইলে আপত্তিকর ভিডিও পাঠিয়ে দেন। ভিডিও দেখার পর পারিবারিক কলহ সৃষ্টি হয় এবং শেষ পর্যন্ত তালাকের সিদ্ধান্ত নেন স্বামী।

বেগমগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার  জহিরুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত মর্মান্তিক। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।  বেগমগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শামসুজ্জামান জানান, অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। এদিকে কুতুবপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি ও বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ কায়েসুর রহমান জানান, অভিযুক্ত শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা চলমান থাকবে। তিনি আরও বলেন, “একজন ফৌজদারি মামলার আসামিকে শিক্ষক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক যদি চায় অভিযুক্ত শিক্ষক স্কুলে প্রবেশ না করতে আমাদের জানালে কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে । ঘটনাটি এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবারসহ স্থানীয়রা।