পাহাড়ি নারীদের কাছে কোমর তাঁত খুবই জনপ্রিয়। তবে কালের বির্বতনে হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের নৃ-গোষ্ঠীদের ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁত। সুতাসহ কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন আর কাপড় তৈরি করে পোষাতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন পাহাড়ের বসবাসকারী নৃ-গোষ্ঠীর নারীরা। আলীকদম সদর ইউনিয়নের কয়েটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায় অবসর সময়ে নৃ-গোষ্ঠীর নারীরা কাঠ ও বাঁশের কাঠি দিয়ে বিশেষ কায়দায় কোমরের সঙ্গে বেঁধে তাঁতে কাপড় বুনছেন। এটিকে কোমর তাঁত বলা হয়। বাড়িতে বসে কোমর তাঁত ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যা নারীরা। পানবাজার ভারত মোহন পাড়ায় গিয়ে দেখা যায় কোমরতাঁতে পালেন্দ্রি ত্রিপুরা (৪৫) নামের এক নারী ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক রিনাই বুনছেন। তাঁর সাথে কথা বলে জানা যায়,‘বিগত সময়ে মায়ের কাছ থেকে তাঁত বুনার কাজ শিখে গত বিশ বছর এ কাজের সাথে তিনি জরিত আছেন। ঐতিহ্যগত ভাবে নিজেরাই এসব পোশাক তৈরি করেন। পাশাপাশি গ্রামের নারীরা অর্ডার দিলে অর্থের বিনিময়ে তা তৈরি করে দেন। প্রতিটি রিনাই সুতার গুণগত দিক বিবেচনায় দের থেকে দুই হাজার টাকা করে বিক্রি হয়। একটি রিনাই’র কাজ শেষ হতে প্রায় ১৫- ২০ দিন সময় লাগে। শত শত বছর আগে থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃ- গোষ্ঠীর নারীরা নিজেদের পরনের কাপড় নিজেরাই বুনতো। কোমর তাঁতে এসব কাপড় বোনা হতো। একটা সময় নৃ- গোষ্ঠীর নারীদের বিয়ের যোগ্যতা হিসেবে কোমর তাঁত বোনা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় সে ঐতিহ্য এখন আর নেই। প্রায় বিলুপ্তির পথে কোমর তাঁত। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠির নারীরা জানান,একটা সময় পাহাড়ি এলাকায় উৎপাদিত তুলা থেকে চরকার মাধ্যমে সুতা তৈরি করে তা দিয়ে পিনন ও থামির কাজ করা হতো। তবে বর্তমানে পাহাড়ি তুলার উৎপাদন কমে গেছে। তাই নারীরা বাজার থেকে সুতা ও উল কিনে কাপড় বুনছেন।
আলীকদম পানবাজার এলাকার বলেন, “এটি আমাদের ত্রিপুরা নারীদের ঐতিহ্য পেশা। যুগ যুগ ধরে আমরা কাপড় বুনন করে আসছি কোমর তাঁত দিয়ে । কিন্তু এখন বাজার থেকে সুতা কিনে কাপড় তৈরি করবো সেই সামর্থ্য নেই। সুতার দাম বাড়তি, তাই সরকারের কাছে আকুল আবেদন আমাদেরকে বিনামূল্যে সুতা দিলে আমরা খুবই উপকৃত হবো।” বিশেষ করে আলীকদম উপজেলার দূর্গম পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীরা বংশ পরম্পরায় এ কাজ শিখেছেন। পাহাড়ে প্রায় সব ক্ষুদ্র নৃ- গোষ্ঠীর মানুষ কোমর তাঁত বুনেন। বিশেষ করে ত্রিপুরা,চাকমা,তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো সম্প্রদায়ের লোকজন কোমর তাঁত বুনতেন। চাকমা ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যা নারীদের তৈরি করা পিনন-খাদি বেশি জনপ্রিয়। পিনন-খাদি ছাড়াও কোমর তাঁতে বোনা হয় গামছা, লুঙ্গি,ওড়না,চাদরসহ বিভিন্ন ব্যবহারের বস্ত্র। ৩নং নায়পাড়া ইউনিয়নের রোয়াম্ভু এলাকার সোনাবী চাকমা বলেন,“সরকার যদি আমাদের সহযোগিতা করে তাহলে পিনন, খাদি বুনন করে বাজারে বিক্রয় করার মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়ন করতে পারবো।”
এদিকে,আধুনিকতার ছোঁয়া আর যন্ত্রপাতির প্রভাবেও হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁত। সুতা ও রংয়ের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং বাজারজাত সংকটের কারণে যারা এটিকে পেশা হিসেবে নিয়েছে তারও পোষাতে পারছে না। এখন বাজারে মিলছে মেশিনে বানানো উপজাতীয় বস্ত্র। আলীকদমের পানবাজার এলাকায় এক সময় ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের কার্যক্রম থাকলেও এখন সেটি বন্ধ রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁত রক্ষায় সরকার উদ্যোগ নিবে এমন প্রত্যাশা বিশিষ্টজনদেরও।