১৩ মাস পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী শিশু খাদিজা আক্তার (০৬) প্রকাশ মীমকে খুনের দায় স্বীকার করেছে আসামীরা। উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের কালিশিমুল গ্রামে বসে সালিসসকারক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় ক্ষমা চেয়ে ২০-২৫ দিন আগে হত্যার বিষয়টি নিস্পত্তি হয়েছে। সালিসে শিশু মীমের লাশের মূল্য নির্ধারন করা হয়েছে ১১ লাখ ১০ হাজার টাকা। টাকা পাওয়ার পর মামলাটি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন মীমের পিতা আলী ইসলাম। এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মীমের ঘনিষ্ট স্বজন ছানা উল্লাহ।
অনুসন্ধান ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, পাকশিমুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী শিশু মীমকে দুই আনা স্বর্ণের জন্য প্রতিবেশীরা খুন করেছে। ঘটনার পর থেকেই এমন অভিযোগ করে আসছিলেন পরিবার,স্বজন ও গ্রামবাসী। প্রতিবেশী মনসুর (৫৩) আনসর (৫০) ও জান্নাতকে (১৭) আসামী করে সরাইল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন মীমের পিতা আলী ইসলাম। মামলাটি দীর্ঘ সময় থানায় ঘুরলেও নথিভূক্ত হয়নি। শুরূ থেকেই বাদী পক্ষের অভিযোগ ছিল আসামী পক্ষ প্রভাবশালী। তাই তারা হত্যার বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে টাকার পাশাপাশি তদবির করছেন। প্রথমে পুলিশ পরে পিবিআই’র তদন্ত প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হননি বাদী পক্ষ। আদালতে নারাজি আবেদন করলে তদন্তের দায়িত্ব পান জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (সিআইডি)। এরই মধ্যে আদালতে পুন:তদন্তের আবেদন করেন বাদী। বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সরাইল আমলী আদালত আবেদন মঞ্জুর করে শিশু মীমের লাশ কবর থেকে উত্তোলনপূর্বক সুরতহাল ও পুন:ময়নাতদন্ত প্রস্তুত কার্যক্রমে উপস্থিত থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানের জন্য সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিষ্ট্রেট প্রিন্স সরকারকে দায়িত্ব প্রদান করেন। এরই প্রেক্ষিতে ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ নভেম্বর বুধবার কবর থেকে শিশু মীমের লাশ উত্তোলন করা হয়েছে। লাশ উত্তোলনের সময় উপস্থিত ছিলেন সিআইড’র ইন্সপেক্টর মোবারক হোসেন সরকার, মো. হানিফ সরকার, এস.আই এনামুল হক ও সরাইল থানার এস.আই রাজিব বড়ুয়া। মীমের পিতা আলী ইসলাম ও পরিবারের লোকজন তখন অভিযোগ করে বলেন, আসামীরা প্রকাশ্যে হত্যার কথা স্বীকার করে টাকায় রফাদফা করার প্রস্তাব দিচ্ছে। তারপরও অজানা কারণে প্রশাসন তাদের বিরূদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। আমরা বারবার টাকার কাছে হেরে যাচ্ছি। সত্যটা দেখতে চাই। সম্প্রতি আসামী পক্ষের লোকজন খুনের দায় স্বীকার করে বাদী পক্ষের সাথে বিষয়টি নিস্পত্তির চেষ্টা তদবির করতে থাকেন। এক পর্যায়ে বাদী পক্ষের লোকজন নিস্পত্তিতে রাজি হন। ভূঁইশ্বর বাজারে এলাকার গণ্যমান্য কয়েকজন লোক নিয়ে সালিস বসে। সালিসে আসামীরা শিশু মীমকে হত্যার দায় স্বীকার করেন। সালিসকারকরা সর্বসম্মতিক্রমে আসামী পক্ষের ১১ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। সেই সাথে আসামীরা কানে ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এই টাকাটা স্থানীয় ইউপি সদস্যের মাধ্যমে শিশু মীমের পিতা আলী ইসলামকে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আলী ইসলাম উকিলের সহায়তায় হত্যা মামলাটি প্রত্যাহার করে নেন। মীমের ঘনিষ্ট স্বজন ছানা উল্লাহ বলেন, ভূঁইশ্বরে ও নিজেদের গ্রামে অভিযুক্তরা খুনের দায় স্বীকার করেছে। এ জন্য তারা কানে ধরে ক্ষমা চেয়েছে। সালিসে তাদের ১১ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। টাকাটা মেম্বারের কাছে দেওয়া হয়েছে। মীমের পিতা ও আমরা প্রকৃত সত্যটা উৎঘাটনের জন্য অনেক পরিশ্রম করেছি। সত্যটা বেরিয়ে আসছে। তাই বুকে ব্যাথা রেখেও আমরা আনন্দিত। প্রসঙ্গত: ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রূয়ারি মাসের ১৮ তারিখ মঙ্গলবার মাত্র দুই আনা স্বর্ণের জন্য পরিকল্পিত ভাবে শিশু মীমকে হত্যা করেছিল প্রতিবেশী কয়েকজন। পরে মীমের লাশ রাতের অন্ধকারে ২/১ জায়গা ঘুরিয়ে বাড়ি সংলগ্ন পুকুরের পানি ও শুকনা জায়গা মিলিয়ে ফেলে রেখেছিল। সেখান থেকেই পুলিশ মীমের লাশ উদ্ধার করেছিলেন।