চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা

প্রকল্পের অগ্রগতি নয়, সমন্বয়ই মূল চাবিকাঠি

এফএনএস | প্রকাশ: ১০ মে, ২০২৬, ০৩:১৬ পিএম
প্রকল্পের অগ্রগতি নয়, সমন্বয়ই মূল চাবিকাঠি

প্রায় এক দশক ধরে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কাগজে-কলমে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি ৯০ শতাংশ ছাড়ালেও বাস্তবে সামান্য বৃষ্টিতেই যখন নগরীর প্রধান সড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে-সমস্যা কোথায়? চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সিটি করপোরেশনের পৃথক তিনটি প্রকল্পে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার সুফল নাগরিকরা পাচ্ছেন না। বরং ছয় মিলিমিটার বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, সমস্যা প্রকল্পের পরিমাণে নয়, বরং পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের গুণগত মানে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার মূল কারণ বহুমাত্রিক। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নদী ভরাট, পাহাড় কাটা এবং সর্বোপরি দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বছরে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ বর্জ্যরে একটি বড় অংশ খাল ও নালায় গিয়ে জমা হওয়ায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। তবে এসব কারণ নতুন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এত বড় অঙ্কের প্রকল্প গ্রহণের পরও কেন সমস্যার স্থায়ী সমাধান আসছে না? এর অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সমন্বয়হীনতা। বন্দর, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিটি করপোরেশন-সবগুলো প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন কর্তৃত্বের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় কার্যকর সমন্বয় গড়ে ওঠে না। ফলে একটি সংস্থার কাজ অন্যটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না, যা পুরো ব্যবস্থাকেই অকার্যকর করে তোলে। অন্যদিকে, প্রকল্প বাস্তবায়নের পর রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। খাল খননের কাজ শেষ হলেও তা নিয়মিত পরিষ্কার না রাখলে দ্রুতই পুনরায় ভরাট হয়ে যায়। বর্তমান প্রযুক্তি ও জনবলের সীমাবদ্ধতায় সিটি করপোরেশন এত বড় অবকাঠামো কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারছে না-এটিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জবাবদিহির অভাব। প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া-এসবের জন্য দায় নির্ধারণ না হলে একই ধরনের সমস্যা বারবার ফিরে আসবে। নাগরিকদের মধ্যেও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে, তবে তা কোনোভাবেই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দায় এড়ানোর অজুহাত হতে পারে না। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে এখন প্রয়োজন সমন্বিত ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ। একাধিক সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, খাল-নদী পুনরুদ্ধার এবং সিটি করপোরেশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি-এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্প গ্রহণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই নগরীর বারবার জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত হওয়া কেবল নাগরিক দুর্ভোগ নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই আর বিলম্ব নয়-কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে