বরিশাল জেলার গৌরনদী ও আগৈলঝাড়ার দুই উপজেলার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ টরকী-বাসাইল খাল এখন মরণঘাতী জীবাণুর ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দখলমুক্ত ও পুনঃখননের দাবি জানিয়ে আসলেও কার্যত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন। দীর্ঘদিন খাল খনন না করায় খাল ও সংযুক্ত নদীর নাব্য সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে নদী থেকে খালে পানি প্রবেশ করছে না। এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ বাঁধ, অপরিকল্পিত ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, খালের জায়গা দখল করে কাঁচা-পাকা স্থাপনা নির্মাণ এবং নির্বিচারে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে খালটির আজ এই বেহাল দশা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইংরেজ শাসনামলে মাদারীপুর মহকুমার তৎকালীন প্রশাসক মি. জিটি ডনোভানের উদ্যোগে খালটি খনন করা হয়। একসময় এই খাল দিয়েই এলাকার কৃষিসেচ, দেশীয় প্রজাতির মাছের জোগান ও নৌ-যোগাযোগ ছিলো।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খালের পানি কুচকুচে কালো। পানির ওপরে ভাসছে প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল ও গৃহস্থালি বর্জ্য। দুই উপজেলার দুই পাড়ের অধিবাসীদের অধিকাংশই টয়লেট নির্মাণ করে পরোক্ষভাবে বর্জ্য খালে ফেলছেন। এ ছাড়া পোল্ট্রি ও গরুর খামারের বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলাসহ পুরো খালটিকে এলাকাবাসী ময়লার ভাগাড় হিসেবে ব্যবহার করছে।
খালের দুই পাড়েই গড়ে উঠেছে অসংখ্য জনবসতি। পাশাপাশি রয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির ও প্রাথমিক-মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রতিদিন শত শত শিশু-কিশোর এই দূষিত খালের পাড় দিয়ে যাতায়াত করে। খালের দুর্গন্ধ ও মশা-মাছির কারণে গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া দুই উপজেলার মানুষই ডায়রিয়া, আমাশয়, চর্মরোগ, ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন। পরিবেশকর্মী, স্থানীয় ভুক্তভোগী কৃষকসহ এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তারা খালটি দখলমুক্ত ও পুনঃখনন করার দাবি জানিয়ে আসছেন। দুই উপজেলার প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দিয়েছেন। কিন্তু কার্যত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি স্থানীয় প্রশাসন। আগৈলঝাড়া উপজেলার চেংগুটিয়া গ্রামের কৃষক কাওছার তালুকদার বলেন, ‘এই খাল দিয়ে একসময় নৌকা চলাচল করতো, জমিতে পানি দিতাম। এখন ময়লার ডিপো। দুই উপজেলার মানুষ ভোগান্তিতে কিন্তু কেউ দেখেনা।’
আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গোলাম মোর্শেদ সজীব বলেন, ‘বদ্ধ জলাশয় কিংবা টয়লেটের বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলায় পানি মারাত্মকভাবে দূষিত থাকে। এই পানি ই-কোলাই, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস এর জীবাণু বহন করে। এছাড়া ডেঙ্গু রোগ বহনকারী এডিস মশাও বংশ বিস্তার লাভ করে। প্রবাহমান পানিতে জীবাণুর স্থায়িত্ব কম হয় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিও কম থাকে।’
এ বিষয়ে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার লিখন বনিক বলেন, ‘খালটি দুই উপজেলার মধ্যে পড়ায় সমন্বিত প্রকল্প দরকার। খননের জন্য প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে অবৈধ দখল ও টয়লেটের সংযোগ উচ্ছেদের ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের গৌরনদী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘১০ কিমি খালের মধ্যে গৌরনদী অংশে প্রায় ৬ কিমি পড়েছে। দুই উপজেলার দখলদারদের তালিকাসহ প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু হবে বলে আশা করা যায়।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই উপজেলার প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদাসীনতার কারণেই খালটি এখন মহামারির উৎস হয়ে উঠেছে। জরুরি ভিত্তিতে যৌথভাবে দখল উচ্ছেদ, খনন ও টয়লেটের সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করলে বড় ধরনের স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না।