মহান মুক্তিযুদ্ধের ৯ নম্বর সেক্টরের বৃহত্তর বরিশাল সাব-সেক্টরের সেকেন্ড ইন কমান্ড (সহ-অধিনায়ক) অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন বীর বিক্রম এমএ হক (৮৫) আর নেই।
বার্ধক্যজনিত কারণে ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার দিবাগত রাত ১১টার দিকে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহির...রাজিউন)। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন রেখে গেছেন। শনিবার (৩০ মে) বাদ আসর মরহুমের জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গৌরনদী উপজেলার সাকোকাঠী গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
উল্লখ্যে, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টরের সহ-অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন গৌরনদী উপজেলার সাকোকাঠী গ্রামের বাসিন্দা এমএ হক। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বর্পূণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বীর বিক্রম উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বীর বিক্রম ক্যাপ্টেন এমএ হক এ প্রতিনিধির কাছে সর্বশেষ এক সাক্ষাতকারে বরিশাল মুক্ত দিবস (৮ ডিসেম্বর) উপলক্ষে এক সাক্ষাতকারে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ১৯৭১ সালের ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যদিয়ে ভোলা, ঝালকাঠিসহ ৯ নম্বর সেক্টরের বৃহত্তর বরিশাল সাব সেক্টরের সব কয়টি উপজেলা শক্রমুক্ত করার পর ৬ ডিসেম্বর আমাদের গোয়েন্দা এবং তৎকালীন বরিশাল জেলা প্রশাসক আইউবুর রহমানের গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি, যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া অঞ্চলের হানাদার বাহিনী নদী পথে ঢাকা যাবার জন্য বরিশালের ওয়াপদা কলোনী ও ত্রিশ গোডাউন এলাকায় একত্রিত হয়েছে।
জেলা প্রশাসক গোপন সংবাদে বলেছেন, ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বিকেল তিনটায় জেলা প্রশাসকের অফিসে একটি সংক্ষিপ্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় হানাদার বাহিনীর উচ্চ পদস্ত অফিসারগণ উপস্থিত ছিলেন। তারা ১৬টি নৌযান (ছোট-বড় লঞ্চ) জব্দ ‘‘রিকোযিশন’’ করে বরিশাল শহরের নেভাল জেটিতে ৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যার মধ্যে হাজির করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন।
আমরা (এমএ হক) জানতে পা, উক্ত নৌযানে প্রায় এক ব্রিগেট হানাদার সৈন্য ৭ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে ভাড়ী অস্ত্রে সু-সজ্জিত হয়ে ৮ ডিসেম্বর সকাল ছয়ঘটিকায় ঢাকার উদ্দেশ্য যাত্রা করিবে। এর প্রেক্ষিতে ৬ ডিসেম্বর সাব সেক্টরের টাউন সুইছাইডাল কমান্ডার রেজা সত্তার ফারুকের মাধ্যমে সাব সেক্টরের সকল বেইজ কমান্ডারদের নিয়ে বরিশাল শহরের কীর্তনখোলা নদীর পূর্ব তীরে সাহেবেরহাটে সাব সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন শাজাহান ওমরসহ আমি (এমএ হক) একটি সংক্ষিপ্ত সভা করি।
এমএ হক আরও বলেছিলেন-উক্ত সভায় সিদ্ধান্ত হয়-ভাড়ী অস্ত্রে সজ্জিত প্রায় এক ব্রিগেট হানাদার সৈন্য (আনুমানিক ৮/৯শ') কে আক্রমন করতে হইলে আমাদের কাছে যে অস্ত্র আছে তাহা দিয়া আক্রমন করা সম্ভব নয়। তাই এ ব্যাপারে যুদ্ধ বিমানের আক্রমন ছাড়া হানাদারদের প্রতিহত করা সম্ভব নয়।
এছাড়াও বরিশাল শহরের একমাত্র ওয়াপদা কলোনি ও ত্রিশ গোডাউন এলাকা ছাড়া পুলিশ লাইনের উত্তরের অংশ সম্পূর্ন শত্রু মুক্ত আছে বিধায় বরিশাল শহরের সার্কিট হাউজে ওঠা সম্ভব। বরিশাল পুলিশ লাইনের ওয়ার্লেস ভালো থাকলে খুলনা যেহেতু শত্রু মুক্ত আছে, সেখানে যোগাযোগ করিয়া সেক্টর কমান্ডার এমএ জলিল এবং দক্ষিণ বাংলার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ওরফে মঞ্জু ভাইর কাছে ইন্ডিয়ান এয়ার সার্পোট পাওয়া গেলে হয়তো উক্ত বাহিনীকে ধ্বংস করা সম্ভব হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।
বীর বিক্রম এমএ হক আরও বলেছেন-এমতাবস্থায় ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর ভোর ছয়টার দিকে বরিশাল শহরের উত্তর পাশে আদম আলী হাজির ঘাটের পাশদিয়ে নতুন বাজার খালে প্রবেশ করি। আমাদের নৌবহর নতুন বাজারে প্রবেশ করার পর সতর্কতার সাথে পরীক্ষা নিরিক্ষা করার পর বরিশাল শহরের সার্কিট হাউজে উঠি। কিভাবে এবং কিউপায় অবলম্বন করিলে বিশাল হানাদার বাহিনীকে ধ্বংস করা সম্ভব হইবে, একপর্যায় ওয়ার্লেসের মাধ্যমে খুলনায় সেক্টর কমান্ডার এমএ জলিলের সাথে যোগাযোগ করিয়া ব্যবস্থা গ্রহন করা যায় কিনা, এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পরে আমি (এমএ হক) নিজে এবং টাউন সুইসাইডাল স্কট কমান্ডার রেজাই সত্তার ফারুক পুলিশ লাইনের ওয়ার্লেসে যাই। সেখানে ওয়ার্লেসের যন্ত্র পাতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে থাকতে দেখি এবং ডোকার ফাঁদ আছে কিনা (বুবি স্ট্রাফস্) আছে কিনা পরীক্ষা করি এবং নিরাপদ অবস্থায় পাই। পরে ব্যাটারি এবং যন্ত্রাংশ সংযোজন করিয়া যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হই। আমাদের সাবসেক্টর কমান্ডার যেহেতু পাকিস্তান সেনা বাহিনীর সিগনাল কোরের অফিসার তিনি এই ব্যাপারে ওয়ার্লেস ওপারেট করে যোগাযোগ করিতে সক্ষম হইবে বলে ধারনা করি। তাৎক্ষনিক সার্কিট হাউজে অবস্থানরত সাবসেক্টর কমান্ডারের নিকট আসি এবং সকল ঘটনা অবহিত করি। তিনি বলেন, আমাকে ওয়ার্লেসে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করো। আমাদের নিকট সুইসাইডাল স্কটের জব্ধকৃত ছোট উইলি ওপেনজিপে করে তাহাকে ওয়ার্লেসে নিয়ে যাই, কারন তিনি (সাব সেক্টর কমান্ডার যুদ্ধাহত পায়ে পেলাস্টার করা ছিল)। তিনি ওয়ার্লেস অপারেট করে খুলনার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং সেক্টর কমান্ডার এমএ জলিলকে সেটে আসার জন্য অনুরোধ করেন। কিছু সময়ের মধ্যে সেক্টর কমান্ডার মেজর এমএ জলিলের সাথে ওয়ার্লেসে কথা হয়। তিনি বলেন যে, বরিশালের হানাদার বাহিনীর এক ব্রিগেট সৈন্য ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর সকাল ছয় ঘটিকায় ১৬টি নৌযানের মাধ্যমে ভাড়ী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঢাকার উদ্যেশ্যে রওনা হইবে। কাজেই আমাদের কাছে যে অস্ত্র অছে তাহা দিয়া আক্রমন করা সম্ভব হইবেনা। যেকারণে আমাদের এয়ার সাপোর্ট বিশেষ জরুরী।
মেজর এম.এ জলিল উত্তরে বলেন, অপেক্ষা করো। আমি নুরুল ইসলাম মঞ্জু ভাইয়ের মাধ্যমে এয়ার ব্যাইজ ইন্ডিয়ার সাথে যোগাযোগ করে জানাচ্ছি। তখন ২ টা ৩০ মিনিট। মেজর জলিল বলেন, ইন্ডিয়ান এয়ার বেইজের তিনখানা ফাইটার জেট ৮ ডিসেম্বর সকাল ছয়টার মধ্যে টার্গেট মোতাবেক কীর্তনখোলা নদীর উত্তরে নন্দির বাজার পর্যন্ত এলাকায় আক্রমন চালাবে। তোমরা বরিশাল শহরের উচ্চস্থানে সাদা পতাকা উড়িয়ে দিবে এবং নদীর দুই তীরে মুক্তিযোদ্ধাদের ডেপলয় করাবে।
পাশাপাশি বিমান হামলার সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধারাও আক্রমন করিবে। উক্ত সংবাদের পরে আমরা বরিশাল শহরে ১৪৪ ধারা ‘‘কার্ফিউ’’ জারি করি এবং শহরের উচ্চস্থানে ওয়ার্লেসসহ পোস্ট অফিস, আদম আলী হাজির বিল্ডিংসহ সর্বত্র সাদা পতাকা উড্ডয়ন করি। মুক্তিযোদ্ধাদের নদীর দুই তীরে অবস্থান করার জন্য নির্দেশ প্রদান করি এবং অপেক্ষা করি। এমএ হক আরো বলেছেন, ঘড়ির কাটায় কাটায় ৮ ডিসেম্বর ভোর ছয় ঘটিকার সময় হানাদার বাহিনীর নৌ-বহর নেভাল জেটি থেকে ঢাকার উদ্যেশে রওনা করে। একপর্যায়ে আমরা বিব্রতবোধ করি যে, সকাল ছয়টায় ইন্ডিয়ান ফাইটারদের আঘাত আনার কথা কিন্তু কোথাও বিমান দেখা যাচ্ছেনা।
অপরদিকে হানাদার বাহিনীর বিশাল নৌ-বহর এগিয়ে চলেছে। হঠাৎ ছয়টা তিন মিনিটে দক্ষিণ আকাশে তিনখানা ফাইটার জেট দেখা যায়। প্রথমে বরিশাল শহরের ওপর দিয়ে প্রদক্ষিন করে। এরপর টার্মিনালে একটি বোমা নিক্ষেপ করে সোজা দক্ষিণ দিকে চলে যায়। মুহুর্তের মধ্যে পুনঃরায় নৌ-বহরের ওপর চড়াও হয়। প্রথম ফাইটারটি ব্রাশ ফায়ার, দ্বিতীয়টি বোমা নিক্ষেপ এবং তৃতীয়টি ব্রাশ ফায়ার করে। এভাবে প্রায় ২০মিনিট কোটাই করার পর নৌবহর সম্পূর্ন ধ্বংস হয়ে যায়। হানাদার সৈন্যদের মধ্যে যারা নদী সাতরে কিনারে ওঠার চেষ্টা করে তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করে হত্যা করে। এভাবেই ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর বরিশাল শত্রু মুক্তর পর বরিশাল শহরের আপামর জনসাধারণ স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠেন।
এই সাক্ষাতকারটিই ছিলো মহান মুক্তিযুদ্ধের ৯ নম্বর সেক্টরের বৃহত্তর বরিশালের সাব-সেক্টরের সেকেন্ড ইন কমান্ড (সহ-অধিনায়ক) অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন বীর বিক্রম এমএ হকের জীবনের শেষ সাক্ষাতকার।