প্রতিষ্ঠার ৯৫ বছর পর এলামনাই গঠনের উদ্যোগ

পত্নীতলায় ঐতিহ্যবাহী নজিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সম্মাননা

এফএনএস (মোঃ আতাউর রহমান; পত্নীতলা, নওগাঁ) : | প্রকাশ: ৩০ মে, ২০২৬, ০৬:৩৪ পিএম
পত্নীতলায় ঐতিহ্যবাহী নজিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সম্মাননা

নজিপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় নওগাঁর একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আজ থেকে ৯৫ বছর আগে পত্নীতলা উপজেলার নজিপুরে আত্রাই নদীর কোল ঘেঁষে মনোরম পরিবেশে কতিপয় বিদ্যুৎসাহী ব্যক্তির প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে এই বিদ্যাপিঠ। এই বিদ্যাপিঠ থেকে শিক্ষা জীবণ শেষ করে শত শত মেধাবী শিক্ষার্থী দেশ বিদেশে বিভিন্ন সেক্টরে অবদান রেখে চলেছে। দীর্ঘ এই ৯৫ বছরে নজিপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষক ও কর্মচারী। এদের মধ্যে ইতিমধ্যে মৃত্যবরণ করেছেন প্রায় ২৫জন। নজিপুর সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে বহু নামকরা শিক্ষক অবসর গ্রহণ করলেও বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কখনও সংবর্ধনা প্রদান করা হয়নি। অপরদিকে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে তলানীতে নামতে থাকে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান। সেই সাথে ঐতিহ্য হারাতে শুরু করে এই সুনামধন্য বিদ্যাপিঠটি। সম্প্রতি নজিপুর সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের দুই পক্ষের মারামারির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে যা সারাদেশে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাঁরা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি প্রাণের বিদ্যাপিঠের এই দুরাবস্থা। তাই দেশের বিভিন্ন সেক্টরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মেধাবী কতিপয় সাবেক শিক্ষার্থী নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে প্রিয় বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান সমুন্নত রাখা এবং সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঐক্য গঠনের লক্ষ্যে অ্যালামনাই এ্যাসোসিয়েশন গঠনের উদ্যোগ এবং অবসরপ্রাপ্ত প্রিয় শিক্ষকদের সম্মাননা প্রদান করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। 

নজিপুর সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি অ্যালামনাই এ্যাসোসিয়েশন গঠন এবং শিক্ষক সম্মাননা প্রদানের লক্ষ্যে ঈদুল আযহার পর দিন গত ২৯ মে ২০২৬ তারিখে জেলা পরিষদ হলরুমে বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগ দিনব্যাপি এক বর্ণাঢ়্য অনুষ্ঠান মালার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে গত ৯৫ বছরে বিদ্যালয় হতে অবসরে যাওয়া ১৬ জন জীবিত ও ২২জন মৃত শিক্ষককে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করা হয়। এছাড়াও একই অনুষ্ঠান থেকে ৬জন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীকেও সম্মাননা প্রদান করা হয়। এই অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিলো বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাবু নামে যে ব্যক্তিটি ভাজা বিক্রয় করতো তাঁকেও সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। অনুষ্ঠান স্থলে ভাজা ওয়ালা ষাটোর্ধ বাবু দাকে ভাজার দোকান দিতে দেখা গেছে। 

শিক্ষক সম্মাননা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বে করেন নজিপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠনের লক্ষ্যে গঠিত এডহক কমিটির ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক ও বিদ্যালয়ের ১৯৯২ ব্যাচের শিক্ষার্থী সবুজ কুমার। অনুষ্ঠান হতে সম্মাননা প্রাপ্ত শিক্ষকরা হলেন- প্রধান শিক্ষক- মো. লতিফর রহমান শাহ ফকির, এস এম মোজাজ্জল হোসেন, সহকারী শিক্ষক আব্দুল মজিদ আহমেদ, মোজাহার আলী, আছির উদ্দিন, নিত্যানন্দ শীল, অজিত রায়, আজিজার রহমান, প্রমথ নাথ মন্ডল, তছলিম উদ্দিন মিঞা, আব্দুর রশিদ চৌধুরী, আব্দুল মান্নান, আঃ মোতালেব লাইফ, আব্দুল খালেক মন্ডল, আব্দুস ছাত্তার মন্ডল ও রেজাউল করিম মন্ডল।

মরণোত্তর সম্মাননা প্রাপ্ত শিক্ষকরা হলেন- বাবু বিনয় ভুষণ সরকার, খয়ের উদ্দিন আহমেদ, নূর আলম খাদেমুল ইসলাম, আব্দুস ছাত্তার, বশীর উদ্দিন আহমেদ, সেতাব উদ্দিন আহমেদ, মোসলেম উদ্দিন, কার্তিক চন্দ্র মন্ডল, বাবু সুধাংশু শেখর চক্রবর্তী, বাবু তরনী মহন সেন, আব্দুর রহমান, মোজাফ্ফর হোসেন, আব্দুল জব্বার মৌলভি, আব্দুস সোবহান, নাছির উদ্দিন আহমেদ, কাজী আব্দুল জব্বার, বছির উদ্দিন মন্ডল, গোবিন্দ চন্দ্র দাস, মীর মোরছেল আলী, এ, কে, এম নুরুল ইসলাম, বাবু রনজিত কুমার মন্ডল ও বাবু হীরালাল দাস। এছাড়াও সম্মাননা প্রাপ্ত কর্মচারীরা হলেন ফয়জুল ইসলাম (দপ্তরী), আফতাব হোসেন (দপ্তরী) মাওলা বকস (দপ্তরী), বদিউল ইসলাম  (নৈশ প্রহরী), চাঁন মোহাম্মদ (সাইকেল প্রহরী), মোমেনা খাতুন (আয়া) ও নরেশ মুন্সী ওরফে বাবু দা (ভাজা বিক্রেতা)।

সম্মাননা প্রাপ্ত শিক্ষকরা তাদের বক্তব্যে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা কালীন সময়ের স্মৃতিচারণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ধীর্ঘ ৯৫ বছরের বিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো এ ধরণের একটি মনোমুগ্ধকর অনুষ্ঠান উপহার দেওয়ার জন্য তাঁরা সাবেক শিক্ষার্থীদের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে যে এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হতে যাচ্ছে তার প্রতি সকল অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পুর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। এ সময় তারা ২০৩০ সালে বিদ্যালয়েল শতবর্ষ উদযাপন এবং বিদ্যালয়ের সুনাম ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য যা যা করণীয় তা করার জন্য সকল শিক্ষার্থীদের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান। 

অনুষ্ঠানে সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরামর্শমুলক বক্তব্য রাখেন ডাঃ ওবায়দুল হক,  বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েল অধ্যাপক মো. জহুরুল হক, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আখতার হোসেন পাখি, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. কুদরত -ই জাহান, ডাঃ রাজীব, অনুষ্ঠানের সমন্বয়কারী রবিউল ইসলাম প্রমুখ। অনুষ্ঠান শেষে নজিপুর সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে গঠিতব্য এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন এর প্রাথমিক গঠনতন্ত্র সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রায় ৫০টি ব্যাচের সহস্রাধিক সাবেক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন বলে আয়োজক সূত্রে জানা গেছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে