চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরকে আর কোনোভাবেই সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্রের অভয়ারণ্য হতে দেওয়া হবে না বলে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও জুয়া নির্মূলে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেছেন, এসব অপরাধের বিরুদ্ধে সারা দেশে সমন্বিত অভিযান চালানো হবে।
রোববার (৩১ মে) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জঙ্গল সলিমপুরের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এ অঞ্চলে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা হবে এবং কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সেখানে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হবে না।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জঙ্গল সলিমপুর শুধু নয়, এর আশপাশের বেতুয়া ও চা বাগান এলাকাতেও সন্ত্রাসী তৎপরতার তথ্য সরকারের কাছে রয়েছে। এ কারণে পুরো অঞ্চলকে সন্ত্রাসমুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “জঙ্গল সলিমপুর আর কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর এলাকা বা অভয়ারণ্য হিসেবে থাকবে না। পরিকল্পিত যৌথ অভিযানের মাধ্যমে এখানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করা হবে।”
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে সংঘটিত কয়েকটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ীদের বাড়িতে হামলা, গুলি বর্ষণ ও চাঁদাবাজির মতো ঘটনায় সরকার উদ্বিগ্ন। এসব অপরাধ দমনে গত ৯ মার্চ যৌথ বাহিনীর অভিযানের মাধ্যমে জঙ্গল সলিমপুরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। তিনি দাবি করেন, সন্ত্রাসীদের গড়ে তোলা সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ইতোমধ্যে ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, “শুধু সলিমপুর নয়, সারা দেশে চাঁদাবাজি, মাদক ও সন্ত্রাসীদের রুখে দিতে একযোগে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হবে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
জঙ্গল সলিমপুরে অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকৃত স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা হবে না। বরং প্রয়োজন হলে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। এ বিষয়ে কোনো অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে স্থানীয়দের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি বিদ্যমান আইন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমান জুয়া আইন দিয়ে অনলাইনভিত্তিক আধুনিক জুয়া কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য আগামী সংসদ অধিবেশনে নতুন আইন বা সংশোধনী আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণেও আইনি সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান আইনের কিছু সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে অনেক কিশোর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকার আইন পর্যালোচনা করছে।
জঙ্গল সলিমপুরকে মূলধারার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে সড়ক যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সীতাকুণ্ড, ভাটিয়ারী-হাটহাজারী লিংক রোড এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ বাড়িয়ে আধুনিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি ঝুলে থাকা চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তর প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়েও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে র্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। পরে ৯ মার্চ যৌথ বাহিনীর অভিযানে এলাকায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। সর্বশেষ ২৪ মে গভীর রাতে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের নেতৃত্বে কয়েকশ সশস্ত্র ব্যক্তি যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালায়। এ ঘটনায় ২৬ মে সীতাকুণ্ড থানায় ৪৩ জনের নাম উল্লেখসহ প্রায় ৩০০ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
পরিদর্শনের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির, বিজিবি ও র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।