সিলেট শহরতলীর গোয়াবাড়ী এলাকার তারাপুর চা-বাগানে ঘুরতে এসে এক তরুণী ও তার দুই বোন হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিওতে কয়েকজন কিশোর ওই তরুণীর পিছু নিয়ে কটূক্তি এবং বিরক্ত করতে দেখা যায়। পরে স্থানীয়দের উদ্যোগে অভিযুক্ত তিন কিশোরকে আটক করা হলেও সালিশের মাধ্যমে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী তরুণী ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। শনিবার (৩০ মে) তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট ও ভিডিও প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, দুই ছোট বোনকে নিয়ে সিলেটের গোয়াবাড়ী এলাকার একটি চা-বাগানে বেড়াতে গেলে একদল যুবক শুরু থেকেই তাদের অনুসরণ করতে থাকে। একপর্যায়ে তারা অশোভন আচরণ ও কটূক্তি শুরু করে।
প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন যুবক তরুণী ও তার দুই বোনের পেছনে হাঁটছে এবং বিভিন্ন মন্তব্য করছে। ভিডিওর এক পর্যায়ে তরুণীকে বলতে শোনা যায়, “তোমরা মেয়ে দেখো নাই?”এছাড়া একজন যুবককে ক্যামেরার সামনে এসে পোজ দিতে এবং আরেকজনকে ধূমপান করতে দেখা যায়।
তরুণীর দাবি, প্রায় এক কিলোমিটার পথজুড়ে তারা বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হন। এ সময় আশপাশে উপস্থিত কেউ কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করেননি। এ ঘটনায় তার দুই ছোট বোন ভীত ও বিব্রত হয়ে পড়ে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ফেসবুক পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে তরুণী লেখেন, “এভাবেই কি সিলেটে অতিথিদের স্বাগত জানানো হয়? আমি আর কাউকে গর্ব করে সিলেট ভ্রমণের পরামর্শ দিতে পারব না।”
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই নারী পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেন। দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন অঞ্চল হিসেবে পরিচিত সিলেটের পর্যটনকেন্দ্র ও চা-বাগানগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদারের দাবি জানান বিভিন্ন মহল।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযুক্ত তিন কিশোরকে শনাক্ত করে আটক করেন। শনিবার রাতেই তাদের গোয়াবাড়ি এলাকায় নিয়ে আসা হয়। এ সময় তাদের অভিভাবকরাও উপস্থিত ছিলেন। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মুরব্বি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে একটি সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বৈঠকে অভিযুক্ত কিশোররা নিজেদের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চায়। তাদের অভিভাবকরাও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না করার শর্তে এবং ভুক্তভোগী মামলা করলে অভিযুক্তদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করার অঙ্গীকারের ভিত্তিতে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। সালিশে উপস্থিত টুকেরবাজার ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সৈয়দ কাওছার আহমদ বলেন, “আমি খবর পেয়ে সালিশে যোগ দিই। এলাকাবাসী আশ্বাস দিয়েছেন, ভুক্তভোগী মামলা করলে অভিযুক্তদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে। সেই শর্তেই তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”
সালিশে উপস্থিত স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজ খান সজিব জানান, ভিডিও দেখে স্থানীয়রা তিন কিশোরকে ধরে নিয়ে আসে। তাদের বয়স আনুমানিক ১৩ থেকে ১৪ বছর। স্থানীয়দের কাছে তারা নিজেদের দোষ স্বীকার করে এবং ক্ষমা চায়। পরে অভিভাবকদের উপস্থিতিতে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, অভিযুক্ত কিশোরদের বাড়ি টুকেরবাজার ইউনিয়নের গোয়াবাড়ী, জাহাঙ্গীরনগর ও করেরপাড়া এলাকায়। এদিকে ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সক্রিয় হয়েছে। সিলেট মহানগরের বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদুর রহমান বলেন, “নারী পর্যটককে উত্ত্যক্ত করার ভিডিও নজরে আসার পর আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করি। অভিযুক্তদের শনাক্ত করে আটকের চেষ্টা চালানো হয়। তবে পুলিশের আগেই স্থানীয়ভাবে সালিশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “পরে জানতে পারি স্থানীয়রা তাদের আটক করেছিল। তবে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।” সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মো. মনজুরুল আলম বলেন, “ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঘটনার সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নারী ও পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো অভিযোগকে হালকাভাবে নেওয়া হবে না।”