সিলেটে আন্তর্জাতিক মানের এক হাজার শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীনের বিনিয়োগকারীরা। শুধু আগ্রহ প্রকাশেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই ও উপযুক্ত স্থান নির্বাচন কার্যক্রমও শুরু করেছে তারা। এ লক্ষ্যে চীনের একটি উচ্চপর্যায়ের বিনিয়োগকারী প্রতিনিধি দল বর্তমানে সিলেটে অবস্থান করছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীনির্ভরতা অনেকাংশে কমে যাবে। বুধবার (৩ জুন) প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী চীনা প্রতিনিধি দলকে সঙ্গে নিয়ে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন সম্ভাব্য এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। প্রতিনিধি দলটি দুপুরে সাদাপাথর এলাকা, সিলেট হাইটেক পার্ক-সহ কয়েকটি সম্ভাব্য স্থান ঘুরে দেখে হাসপাতাল নির্মাণের উপযোগিতা নিয়ে প্রাথমিক মূল্যায়ন করে। পরিদর্শনকালে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম-সহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা অবকাঠামোগত সুবিধা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ভূমির প্রাপ্যতা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, হাসপাতাল নির্মাণের জন্য স্থান নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। প্রকল্পটির সম্পূর্ণ অর্থায়ন চীনের পক্ষ থেকে করা হবে এবং স্থান নির্বাচন ও প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, “এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সিলেট অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে। চিকিৎসার জন্য রাজধানী ঢাকায় যাওয়ার চাপও অনেকাংশে কমে আসবে।”
তিনি আরও বলেন, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী জেলার রোগীরাও এই হাসপাতালের মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও হাসপাতালটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। চীনা প্রতিনিধি দলের পক্ষে স্টোয়ার্ড চিয়ং বলেন, স্থান পরিদর্শন ও সম্ভাব্যতা মূল্যায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে তারা আশাবাদী। সিলেটের ভৌগোলিক অবস্থান, প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে এর গুরুত্ব এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনায় প্রকল্পটির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
তিনি বলেন, “আমরা বিভিন্ন সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করেছি এবং প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক ধারণা পেয়েছি। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাব। স্থান নির্বাচন ও কারিগরি মূল্যায়ন শেষে পরবর্তী ধাপের কার্যক্রম শুরু করা হবে।” এর আগে মঙ্গলবার রাতে সিলেট সার্কিট হাউসে চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী। বৈঠকে হাসপাতালের সম্ভাব্য স্থান নির্বাচন, প্রকল্পের আকার ও পরিধি, বিনিয়োগ কাঠামো, পরিচালনা ব্যবস্থা এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত হাসপাতালটি নির্মিত হলে এতে আধুনিক জরুরি বিভাগ, হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র, ক্যানসার ইউনিট, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা বিভাগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেটে এ ধরনের বৃহৎ ও আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু চিকিৎসাসেবার মানই বাড়বে না, বরং চিকিৎসা পর্যটন, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দীর্ঘদিন ধরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীমুখী রোগীদের একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবে সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবে। এদিকে হাসপাতাল নির্মাণের সম্ভাব্য ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন সিলেটের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা আশা করছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং সিলেটবাসী একটি আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সুবিধা পাবে।