দেশে সড়ক দুর্ঘটনা যেন এক নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত মে মাসে ৬১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬২২ জন নিহত এবং ১ হাজার ৬৫২ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে রেল ও নৌপথের দুর্ঘটনা যুক্ত করলে মোট দুর্ঘটনার সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৭৬টি, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৭১ জন। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এর প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং একটি অপূরণীয় ক্ষতির প্রতীক। প্রতিবেদনের তথ্য উদ্বেগজনক কয়েকটি বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৬ শতাংশের বেশি এবং নিহতের প্রায় ৩৭ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি মোটরসাইকেল ব্যবহারের দ্রুত বিস্তার, চালকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি, নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা এবং দুর্বল তদারকির বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পথচারী, শিক্ষার্থী, নারী ও শিশু থাকার বিষয়টি প্রমাণ করে যে সড়ক নিরাপত্তা কেবল চালকদের সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক জননিরাপত্তার প্রশ্ন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দুর্ঘটনার প্রায় ৪২ শতাংশ ঘটেছে মুখোমুখি সংঘর্ষে এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটেছে গাড়ির চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার কারণে। এসব ঘটনা সড়কে বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং মহাসড়কে কার্যকর নজরদারির অভাবের ইঙ্গিত দেয়। দুর্ঘটনার প্রায় ৪৫ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে সংঘটিত হওয়াও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা ও সড়ক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে। উল্লেখ্য, এ প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণে একটি সমন্বিত ও আধুনিক জাতীয় ডাটাবেজ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, পথচারীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ, মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি মোটরসাইকেল ব্যবহারে কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিদিনের এই প্রাণহানি কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। সড়ক নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে সরকার, পরিবহন খাত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় দুর্ঘটনার এই দীর্ঘ মিছিল থামানো কঠিন হবে।