কলারোয়ার

কামারালী এখন আদর্শ গ্রাম, নেপথ্যে উদ্যোক্তা আব্দুস সাত্তার

এফএনএস (জুলফিকার আলী; কলারোয়া, সাতক্ষীরা) : | প্রকাশ: ২২ জুন, ২০২৬, ১১:১২ এএম
কামারালী এখন আদর্শ গ্রাম, নেপথ্যে উদ্যোক্তা আব্দুস সাত্তার

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার যুগিখালী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত ও একসময়ের অবহেলিত গ্রাম ‘কামারালী’। কিন্তু আজ সেই চেনা রূপ উধাও। চোখে মেললেই এখন দেখা যায় দিগন্তজোড়া সবুজের সমারোহ। মাঠের পর মাঠ ফসলের হাসিতে মন জুড়িয়ে যায়। পিছিয়ে পড়া এই গ্রামটিকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছেন একজন দূরদর্শী, কঠোর পরিশ্রমী ও সফল কৃষি উদ্যোক্তা-আব্দুস সাত্তার সানা। তাঁর একক প্রচেষ্টা এবং আধুনিক কৃষি ভাবনায় পুরো কামারালী গ্রাম আজ দেশের বুকে এক অনন্য ‘আদর্শ গ্রামে’ পরিণত হয়েছে।

দুই দশকের পথচলা ও স্বপ্নের শুরু: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আব্দুস সাত্তার সানা আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে মৎস্য চাষের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। মাছ চাষে সফলতা পাওয়ার পর তিনি চিন্তা করেন, জমির কোনো অংশই ফেলে রাখা যাবে না। সেই ভাবনা থেকেই বিগত ৫-৬ বছর ধরে তিনি শুরু করেন আধুনিক ও সমন্বিত পদ্ধতিতে সবজি চাষ। বর্তমানে কামারালী মাঠে তাঁর ৫ বিঘা জমির ওপর বিশাল এক মৎস্য ঘের রয়েছে। যার মধ্যে সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে তিনি নিবিড়ভাবে আধুনিক জাতের মাছ চাষ করছেন। আর বাকি ১.৫ (দেড়) বিঘা পতিত জমিকে তিনি রূপ দিয়েছেন এক জীবন্ত প্রদর্শনী খামারে। ঘেরের পাড়ের এক ইঞ্চি জমিও তিনি ফেলে রাখেননি। ঘেরের পাড়ে পাড়ে আজ ঝুলছে খেরই, বরবটি, করলা, উচ্ছে, ঢেঁড়স, শিম, লাউ, কুমড়া আর কলার বাম্পার ফলন। এখন আর কারো দুয়ারে হাত পাততে হয় না, গ্রামের সবাই আজ স্বাবলম্বী। আশীর্বাদের এক জলাধার ‘কামারালী রিজার্ভার’: আব্দুস সাত্তার সানার এই কৃষি বিপ্লবকে আরও বেগবান ও টেকসই করেছে এলাকার ‘কামারালী রিজার্ভার’। বেসরকারি সংস্থা ‘সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া’ ও ‘উত্তরাণ’-এর সহযোগিতায় এবং ওয়াটারশেড কমিটির বাস্তবায়নে প্রকল্পের আওতায় এই রিজার্ভারটি সংস্কার করা হয়। সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহিষ্ণু কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে ২৭৫ ফুট দৈর্ঘ্য, ১১২ ফুট প্রস্থ এবং ১০ ফুট গভীরতার এই জলাধারটি গত মে ২০২৫-এ ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে পুনঃখনন করা হয়। এই রিজার্ভারের কল্যাণে তীব্র খরা বা সেচ সংকটের সময়েও এলাকার কৃষকেরা নিরবচ্ছিন্ন পানির সুবিধা পাচ্ছেন, যা পুরো অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। উঠান বৈঠক: স্বাবলম্বী হওয়ার মূল মন্ত্র: সফল এই উদ্যোক্তা শুধু নিজের ভাগ্যবদল করেই ক্ষান্ত হননি, আলোর দিশারী হয়েছেন পুরো সমাজের। বিগত ৩ বছর ধরে তিনি এলাকার কৃষক ও কৃষাণীদের নিয়ে নিয়মিত ‘উঠান বৈঠক’ করে আসছেন। গ্রামীণ নারীদের ঘরের কোণ থেকে বের করে এনে বাড়ির চারপাশের পরিত্যক্ত ও পতিত জমিতে কীভাবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সবজি চাষ করতে হয়, সেই পরামর্শ ও হাতে-কলমে কারিগরি শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর এই নিঃস্বার্থ পরামর্শ আর দিকনির্দেশনায় অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষ নিজেদের পতিত জমিতে চাষবাস শুরু করেছে। বেকারত্বমুক্ত এক অনন্য ‘আদর্শ গ্রাম’: আজ আব্দুস সাত্তার সানার সেই নীরব সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লবের সুফল ভোগ করছে পুরো কামারালী গ্রাম। বর্তমানে এই গ্রামে কোনো বেকার মানুষ নেই। অলস বসে থাকার দিন ফুরিয়েছে; নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই এখন কোনো না কোনো চাষবাস বা কৃষি কাজের সাথে যুক্ত হয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। একসময় যেসব পরিবারে অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী ছিল, আজ তাদের আর কারো দুয়ারে হাত পাততে হয় না। গ্রামের প্রতিটি পরিবার এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। সরেজমিনে কামারালী গ্রামে গেলে মনে হয় যেন প্রকৃতির এক নিপুণ শিল্পী সবুজ ক্যানভাসে গ্রামটিকে সাজিয়েছেন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই সফল মডেল দেখতে আসছেন। স্থানীয়রা জানান, কামারালী গ্রামের এই অভূতপূর্ব সবুজ সমারোহ এবং প্রতিটি মানুষের মুখে স্বাবলম্বী হওয়ার যে হাসি, তার পিছনের মূল কারিগর আব্দুস সাত্তার সানা। এ বিষয়ে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা জানান, আব্দুস সাত্তার সানার এই সমন্বিত মৎস্য ও সবজি চাষের মডেলটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তিনি যেভাবে গ্রামের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে পুরো এলাকার বেকারত্ব দূর করেছেন, তা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তরুণ ও কৃষকদের জন্য এক দারুণ অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে