একদিকে চলছে অভিযান, অন্যদিকে উদ্ধার হচ্ছে নতুন নতুন চালান। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ধরা পড়ছে মাদক কারবারি। তবুও থামছে না মাদকের প্রবাহ। আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্য অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবস উপলক্ষে রংপুরে মাদকবিরোধী অভিযানের গত পাঁচ মাসের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে একদিকে সাফল্যের চিত্র, অন্যদিকে উদ্বেগের বাস্তবতা। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ, রংপুর জেলা পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং র্যাব-১৩ এর তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে মোট ৭৬১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ৭৬৪ জনকে। পরিচালিত হয়েছে প্রায় দুই হাজারের বেশি অভিযান।
উদ্ধার হয়েছে কয়েক শ কেজি গাঁজা, হাজার হাজার ইয়াবা, বিপুল পরিমাণ ফেন্সিডিল, এস্কেপ ও ফেয়ারড্রিল সিরাপ, হেরোইন, চোলাই মদ এবং নেশাজাতীয় ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট।
মহানগরে ইয়াবা, জেলায় সিরাপ, নতুন ঝুঁকিতে ট্যাপেন্টাডল
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, রংপুর মহানগর এলাকায় ইয়াবার উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে জেলা এলাকায় ফেন্সিডিল, এস্কেপ ও ফেয়ারড্রিল সিরাপের বিস্তার এখনও উল্লেখযোগ্য।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য এসেছে ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট নিয়ে। র্যাব-১৩ এর অভিযানে মাত্র পাঁচ মাসে ৬ হাজার ৮০০ পিস ট্যাপেন্টাডল উদ্ধার হয়েছে। মাদক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের একটি অংশের মধ্যে প্রেসক্রিপশনভিত্তিক নেশাজাতীয় ওষুধের অপব্যবহার বাড়ছে।
সবচেয়ে বেশি অভিযান মহানগর পুলিশের
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ পাঁচ মাসে ১ হাজার ১১৬টি অভিযান পরিচালনা করে ২২৯টি মামলা দায়ের করেছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ২৯২ জনকে। অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ৩০.৮১ কেজি গাঁজা, ৫ হাজার ৭১৮ পিস ইয়াবা, ১১৩ বোতল এস্কেপ সিরাপ, ৭৮ বোতল ফেয়ারডিল, ২২.৭৮৭ গ্রাম হেরোইন, ৩২.৭৫ লিটার চোলাই মদ, ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট, ফেন্সিডিল এবং অন্যান্য মাদকদ্রব্য। উদ্ধার হওয়া ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্যই ১৭ লাখ টাকার বেশি।
জেলা পুলিশের অভিযানে নতুন গতি
রংপুর জেলা পুলিশ পাঁচ মাসে ১৫০টি মামলা দায়ের করে ১৮০ জনকে গ্রেফতার করেছে।
তাদের অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ৫৩.৯৫৪ কেজি গাঁজা, ৫৪৯ বোতল ফেন্সিডিল, ৬১৭ বোতল এস্কেপ সিরাপ, ৩৪৭ বোতল ফেয়ারড্রিল, ২ হাজার ২৬১ পিস ইয়াবা, ২২.৩৭ গ্রাম হেরোইন, ২৩৯.২৫ লিটার চোলাই মদ এবং ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র দুই মাসেই ৯৩টি মাদক মামলা রেকর্ড হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি মাদকবিরোধী অভিযানে দৃশ্যমান তৎপরতার প্রতিফলন।
উদ্ধার পরিসংখ্যানে এগিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রংপুর জেলা কার্যালয় পাঁচ মাসে ৮১২টি অভিযান পরিচালনা করে ২৫১টি মামলা দায়ের করেছে। আসামি করা হয়েছে ২৫৭ জনকে। অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ১১৭ কেজি ৮৩৫ গ্রাম গাঁজা, ৫ হাজার ৪২ পিস ইয়াবা, ৪২.৪৫ গ্রাম হেরোইন, ৩৯৬ বোতল এস্কেপ সিরাপ, ৪৭ বোতল ফেন্সিডিল, ৬০ বোতল ফেয়ারড্রিল, ২৫৫ বোতল রেকটিফাইড স্পিরিট, ৮৮.৯৫ লিটার চোলাই মদ এবং ১ হাজার ৯৭ লিটার ওয়াশ।
এছাড়া জব্দ করা হয়েছে একটি ট্রাক, একটি মোটরসাইকেল, একটি ইজিবাইক, ৩৫ হাজার টাকা জাল নোট, নগদ ১ লাখ ১৯ হাজার ২২৭ টাকা এবং একাধিক মোবাইল ফোন।
সচেতনতার লড়াইটাও চলছে
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু অভিযান নয়, সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রেও ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। পাঁচ মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, সামাজিক সংগঠন এবং কারাগার মিলিয়ে অন্তত ২৩টি মাদকবিরোধী আলোচনা সভা, কর্মশালা, সেমিনার ও প্রচারণামূলক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে ১ হাজার ৪২০টি কলম, ১ হাজার ২৯০টি খাতা, ১ হাজার ৬২০টি জ্যামিতি বক্স, ২৫০টি স্কেল এবং ৭ হাজার ৫৫০টি লিফলেট।
কম অভিযানে বড় উদ্ধার র্যাবের
র্যাব-১৩ পাঁচ মাসে ৭৪টি অভিযান পরিচালনা করে ১৮টি মামলা দায়ের করেছে। গ্রেফতার করেছে ৩৫ জনকে।
অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ৯৪.১ কেজি গাঁজা, ২৬৬ বোতল এস্কেপ, ১৭৩ বোতল ফেয়ারড্রিল, ১ হাজার ৩৯২ পিস ইয়াবা, ৬৪ বোতল ফেন্সিডিল, ৫ গ্রাম হেরোইন এবং ৬ হাজার ৮০০ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিযানের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও বড় চালান শনাক্ত ও উদ্ধারে র্যাবের সাফল্য উল্লেখযোগ্য।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রংপুরের উপ-পরিচালক আবু জাফর বলেন, মাদক নির্মূলে নিয়মিত অভিযান ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম একসঙ্গে পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। রংপুর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে কোনো আপস নেই। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং মাদক কারবারিদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত থাকবে। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, মাদক সমাজের জন্য বড় হুমকি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে সম্পৃক্ত না করে শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
পাঁচ মাসের পরিসংখ্যান বলছে, রংপুরে মাদকবিরোধী অভিযান এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সক্রিয়। তবে একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের তথ্য আরেকটি বাস্তবতাও সামনে আনে, মাদক কারবারিদের নেটওয়ার্ক এখনও পুরোপুরি ভাঙা যায়নি। আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, উদ্ধার ও গ্রেফতারের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি মাদকের চাহিদা কমাতে সমাজ কি যথেষ্ট প্রস্তুত? কারণ মাদকমুক্ত রংপুর গড়ার লড়াই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নয়, পুরো সমাজের।