কিশোরগঞ্জে একটি ‘কিশোর গ্যাং” অপহরণ থেকে শুরু করে সর্বনাশা নানা অপরাধ কালচারে ডুবেছে। অপহরণ থেকে শুরু করে চুরি ছিন্তাই ডাকাতির মতো ঘটনাও ঘটেছে। দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে এদের লাগামহীন দৌরাত্ম্য।
জানা গেছে গত মঙ্গলবার দিন করিমগঞ্জ উপজেলার জাফরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠশ্রেণীর একজন শিক্ষার্থী কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের শোলাকিয়ায় আত্বীয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। সেখান থেকে পর দিন বুধবার বিকেলে পুরান থানা থেকে অটোযোগে করিমগঞ্জ যাওয়ার জন্য গাড়ীতে উঠেন। এ সময় অটো করিমগঞ্জ না গিয়ে জেলা শহরের বড়পুলে গিয়ে শিক্ষার্থীকে যাত্রীবেসে থাকা একটি অপহরণকারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা ভয় দেখিয়ে বলে তোর বাবার নাম্বার দে টাকা পাঠাক না হলে তোকে চুরির অপবাদ দিয়ে থানায় দিয়ে দেবো। এরমধ্যে অপহরণচক্রের মূল হোতা নাজমুল নামের পরিচয় দিয়ে (০১৩২৭-০৬৫৪৫৬) এ নাম্বারে শিক্ষার্থীর বাবা আব্দুল আউয়ালকে হুমকি দিয়ে বলে ৩৫০০ শত টাকা দিতে। ফোন পেয়ে বাবা ছেলে অপহৃত হওয়ার কথা শুনে গ্রামে বিকাশের দোকান নেই বললে শহরে এসে টাকা দিয়ে যেতে চাইলে তখন অপহরণকারীরা বলে আমরা বড়পুলে আছি তুই এখানে আসলে ছেলের মুখ দেখতে পারবে না, গাড়ীর নীচে চাপা দিয়ে ছেলেকে মেরে ফেলবো। ৫০ হাজার টাকা দিয়েও কাজ হবে না। জলদি টাকা পাঠা। পরে তিনি দাবীমত টাকা পাঠালে বলে আদা ঘন্টার ভেতরে পুরান থানার রেইনট্্ির গাছের নীচে অপেক্ষা কর সেখানে পাঠাচ্ছি বাচ্চাকে। এদিকে রাত ১টা বাজলেও ছেলেকে ফেরৎ না পেয়ে বাবার উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। পরে কিশোরগঞ্জ মডেল থানায় গিয়ে দায়িত্বরত ডিউটি অফিসার মো.কাজী সাজ্জাদ হোসেনের কাছে বিষয়টি বললে তিনি ০১৩২৭-০৬৫৪৫৬ নাম্বারে কল দিয়ে ছেলেকে ফেরৎ দেওয়ার কথা বলেন। এরপর আদা ঘন্টা পর ওই শিক্ষার্থীকে অপহরণকারীরা পুরান থানায় অটো দিয়ে এসে নিজ বাড়িতে যাওয়ার অটোতে উঠিয়ে দেয় আর বলে বিষয়টি জানাজানি করলে অসুবিধা হবে। ফলে পরিবারটি এখন নিরাপত্তহীনতায় ভোগছে।
এদিকে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার হাওরে গত বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ইটনা উপজেলার বাদলা ইউনিয়নের বর্শিকুড়া-শেরপুর সেতুসংলগ্ন বগাডুবি খালের কাছে একটি ডাকাতির ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ আছে, ওই সময় একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা থেকে নগদ ৭৫ হাজার টাকা, ২টি মুঠোফোন, ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ ও রান্নার সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায় ডাকাতেরা। পরপর দুই দিনের ডাকাতির ঘটনায় হাওরাঞ্চলে নৌযাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর আগে গত মঙ্গলবার রাতে উপজেলার চংনোয়াগাঁও স্লুইসগেট এলাকায় একটি লাশবাহী নৌকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা জানান, নৌকায় একটি শিশুর মরদেহ রয়েছে বলে অনুরোধ করলেও ডাকাতেরা তা উপেক্ষা করে অস্ত্রের মুখে লুটপাট চালায়। গত এক মাসে হাওরে অন্তত তিনটি ডাকাতির ঘটনায় নৌযাত্রী ও মাঝিদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। স্থানীয় লোকজন হাওরাঞ্চলে নৌ-পুলিশের টহল জোরদার করার এবং জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।
জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, এক মাস আগে সংঘটিত ডাকাতির ঘটনায় জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সম্প্রতি দুই ডাকাতির ঘটনায়ও জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, করিমগঞ্জের বালিখলা ফেরিঘাট, নিকলী বেড়িবাঁধ এবং ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়কে তিনটি পুলিশ কন্ট্রোল রুম স্থাপনসহ হাওরে ডাকাতি প্রতিরোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সন্ধ্যার পর হাওরে নৌযাত্রা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান তিনি।
জানা গেছে চলতি বছরের ১৬ মার্চ বিকালে ডিএমপি ঢাকার মুগদা থানার মুগদাপাড়া এলাকায় র্যাব-১৪ অভিযান চালিয়ে তিন অপহরণকারী আটক করে।আটক মোঃ মাসুদ রানা (২৮) দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ থানার দক্ষিনখান ডিএমপি ঢাকা মোঃ তানভীর(২৮) মোঃ শরীয়তপুর ঘোসাইরহাট থানার সোহাগ(২৯)। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায় বাদী মোঃ জুলহাস মিয়ার (৪৮) মেঝো ছেলে মোঃ দেলোয়ার হোসেন (১৩) ৭ম শ্রেণীতে পড়ুয়া ছাত্র। ৯ মার্চ বিকালে নিজ বাড়ী থেকে সাইকেল নিয়ে বাহিরে বের হয় রাতে বাড়িতে ফিরে না আসলে পরিবারের লোকজন বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে কোথাও ভিকটিমকে পায় নাই। মোবাইল ফোনে অপরিচিত একটি নম্বার থেকে ফোন করে বিশ হাজার টাকা মুক্তিপন দাবী করে মুক্তিপনের টাকা না দিলে ভিকটিমকে খুন করে লাশ গুম করার হুমকি দেয় করে। এ ঘটানায় দেলোয়ার হোসেনের পিতা মোঃ জুলহাস মিয়া (৪৮) বাদী হয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার সদর থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। র্যাব-১৪, কিশোরগঞ্জ ক্যাম্প ছায়াতদন্ত সহ ভিকটিম উদ্ধারসহ অজ্ঞাতনামা আসামিদের আটক করতে তৎপর হয়। র্যাব-১৪ সিপিসি -২ কিশোরগঞ্জ ক্যাম্পের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মিডিয়া অফিসার প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।
গত (১৬ জুন) মঙ্গলবার রাতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার বাদলা থানেশ্বর এলাকা থেকে প্রবাসে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় ও অর্থ আত্মসাতের মামলায় প্রধান অভিযুক্ত খসরু পারভেজ ভুঁইয়া (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। ভুক্তভোগী ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দেড় বছর আগে সৌদি আরবে বৈধ চাকরি ও আকামা (কর্ম অনুমতিপত্র) করে দেওয়ার আশ্বাসে নেত্রকোনার মদন উপজেলার বাসিন্দা মোহন মিয়া নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে পর্যায়ক্রমে প্রায় ১৭ লাখ টাকা গ্রহণ করেন খসরু পারভেজ ভুঁইয়া ও তার সহযোগীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে মোহনকে বিদেশে নিয়ে নানা দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে রাখা হয়। দেশে ফিরে তিনি অভিযুক্তদের কাছে অর্থ ফেরত ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে, তারা অর্থ গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করলেও, টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলার ৫ নং কেওয়ারজোর ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের কুড়াকান্দি গ্রামের বাসিন্দা আতাউর রহমান (পিতা: আব্দুল হেকিম)-এর বিরুদ্ধে মানবপাচার, অবৈধ আটক, নির্যাতন এবং মুক্তিপণ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, আতাউর রহমান তার স্ত্রী এবং শ্বশুরবাড়ির কয়েকজন সদস্যের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলেছেন।এক ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করে তার পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়।
চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকা থেকে অপহৃত ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীকে উদ্ধার করেছে কিশোরগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ। জানা গেছে, ইটনা উপজেলার কমলভোগ গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে সৌরভ (১৯) পাশ্ববর্তী মুদিরগাঁও গ্রামের বিল্লাল মিয়ার মেয়ে আঁখি আক্তার (১৩)-কে অপহরণ করে। আঁখি আক্তার কিশোরগঞ্জ শহরের শোলাকিয়া এলাকায় জনৈক এক ব্যাংক কর্মকর্তার বাসায় ভাড়া থেকে একটি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করতো। তার পিতা বিল্লাল মিয়া সিলেট অঞ্চলে ক্ষুদ্র ব্যবসা করায় মা পারভীন আক্তার মেয়ের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। র্যাব-১৪ অভিযান চালিয়ে অপহরণ মামলা উদ্ধার তিন অপহরণকারী আটক। ঘটনার দিন মাদ্রাসা শেষে বাড়ি ফেরার পথে মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে আঁখিকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর মেয়ে না পাওয়ায় ভিকটিমের পরিবার কিশোরগঞ্জ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের কাছে অপহরণের অভিযোগ দায়ের করেন। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ওসি অপহৃত শিশুকে উদ্ধারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং উপ-পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. আমিনুল ইসলামকে দায়িত্ব প্রদান করেন। পরদিন ইটনা উপজেলার কুর্শা এলাকায় অপহরণকারীর ফুফুর বাড়ি থেকে ভিকটিম আঁখি আক্তারকে উদ্ধার করা হয়।