আজ ১৯ জুলাই। দুই বছর আগে এই দিনটি সিলেটের সাংবাদিক সমাজের জন্য নেমে এসেছিল এক ভয়াবহ শোকের বার্তা নিয়ে। প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট ব্যুরো প্রধান আবু তাহের মোহাম্মদ তুরাব (এ টি এম তুরাব)। একজন পেশাদার সাংবাদিক, সদ্য বিবাহিত একজন স্বামী এবং একটি পরিবারের প্রিয় সন্তানকে হারানোর সেই ক্ষত এখনো শুকায়নি। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি তার হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া। তদন্তের অগ্রগতি, কয়েকজন আসামির গ্রেপ্তার এবং মামলার স্থানান্তর-এই পর্যন্তই দৃশ্যমান অগ্রগতি। কিন্তু তুরাবের পরিবার, সহকর্মী ও সাংবাদিক সমাজের মূল প্রশ্ন এখনো একটাই-কবে হবে হত্যার বিচার?
দুই বছর আগে যে সিলেটে নগরীর কোর্টপয়েন্ট এলাকায় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মিছিল হয়েছিল, সেই স্থান আজও বহন করে একটি রক্তাক্ত স্মৃতি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সিলেট নগরীর ব্যস্ততম ওই এলাকায় পুলিশের গুলিতে আহত হন সাংবাদিক তুরাব। প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার নথি অনুযায়ী, সেদিন তিনি সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করছিলেন। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের এক পর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
ময়নাতদন্তে তার শরীরে ৯৮টি ছররা গুলির আঘাতের কথা উঠে আসে। পরিবারের অভিযোগ, তুরাবকে লক্ষ্য করেই গুলি করা হয়েছিল। চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, গুলির আঘাতে তার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সাংবাদিকতা করতে গিয়ে প্রাণ হারানো
সিলেট প্রেসক্লাব ও বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন সিলেট বিভাগীয় কমিটির সদস্য ছিলেন এ টি এম তুরাব। দীর্ঘদিন ধরে সংবাদ সংগ্রহ ও মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি, জনদুর্ভোগ, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডসহ নানা বিষয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন করতেন তিনি।
ঘটনার দিনও তিনি দায়িত্ব পালন করছিলেন একজন সাংবাদিক হিসেবে। কিন্তু সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি নিজেই হয়ে যান একটি বড় সংবাদ। সহকর্মীদের কাছে তার মৃত্যু শুধু একজন সাংবাদিকের মৃত্যু নয়; বরং মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করে।
তুরাবের পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় বেদনা হলো-তিনি ছিলেন জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করা একজন মানুষ। বিয়ের মাত্র তিন মাসের মাথায় তার স্ত্রী তানিয়া ইসলাম হারান স্বামীকে। বিদেশে থাকা স্ত্রী স্বামীর শেষ মুহূর্তগুলো সরাসরি দেখতে পারেননি। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় শেষ বিদায়ের দৃশ্য থেকেও তিনি ছিলেন বিচ্ছিন্ন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, তুরাবের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছিল। বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতিও চলছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই পুলিশের গুলির আঘাতে থেমে যায় তার জীবন।
মামলা থেকে ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত
তুরাব হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলা প্রথমে সিলেট মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানায় তদন্তাধীন ছিল। পরে তদন্ত যায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে। এরপর মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তের আওতায় আসে।
২০২৫ সালের বিভিন্ন পর্যায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ মামলার তদন্ত অগ্রগতি নিয়ে শুনানি হয়েছে। একটি পর্যায়ে শুনানি পিছিয়ে যায় এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকার কথা জানানো হয়।
মামলার তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, আলামত ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। তবে দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পরও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন বা বিচার শুরুর চূড়ান্ত ধাপ দৃশ্যমান হয়নি।
গ্রেপ্তার হয়েছে কয়েকজন, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে
তুরাব হত্যা মামলায় পুলিশের তৎকালীন সহকারী কমিশনার (এসি) সাদেক কাউসার দস্তগীর এবং পুলিশ কনস্টেবল উজ্জ্বল সিংহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে মামলার এজাহারে থাকা আরও কয়েকজন আসামির গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে স্বজনদের মধ্যে।