চট্টগ্রামের তালিকাভুক্ত ও আলোচিত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনকে যশোর থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বুধবার (২৯ জুলাই) যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য, চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি, হামলা ও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় তার সঙ্গে পাঁচ সহযোগীও ছিলেন বলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানিয়েছে।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মিরাজুল ইসলাম বলেন, যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ঝুমঝুমপুর এলাকায় একটি গাড়ির ভেতর থেকে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে যশোর পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ইমনসহ কয়েকজনকে শুটার হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী ডেভিড ইমন। চট্টগ্রাম নগরী এবং রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতে বিভিন্ন চাঁদাবাজি, হুমকি ও হামলার ঘটনায় তার নাম উঠে এসেছে। তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ডেভিড ইমনের নাম সর্বশেষ আলোচনায় আসে চট্টগ্রামের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ডট নেটের (ডিডিএন) কার্যালয়ে হামলা ও লুটের ঘটনায়। ১৩ জুলাই দুপুরে নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা-বাকলিয়া এক্সেস সড়কে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে ৩০ থেকে ৩৫ জন সশস্ত্র ব্যক্তি হামলা চালান। এ সময় কার্যালয়ে থাকা বেতনের ৩৫ লাখ টাকা লুট করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলার দুই দিন আগে, ১১ জুলাই ডিডিএনের মালিক আদিল বিন মামুনের মোবাইলে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। ফোনে নিজেকে ডেভিড ইমন পরিচয় দিয়ে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার দাবি করা হয়।
ওই ফোনে হুমকি দিয়ে বলা হয়, টাকা না দিলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা অন্যরা চালাবে। একই সঙ্গে পুলিশ কমিশনারের কাছ থেকে তার পরিচয় জেনে নেওয়ার কথাও বলা হয়। এরপরই ডিডিএন কার্যালয়ে প্রকাশ্যে হামলা ও লুটের ঘটনা ঘটে। ওই হামলার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ডিডিএন কার্যালয়ের কাছেই স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসা। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশি পাহারায় থাকা ওই বাসা লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এর আগে ২ জানুয়ারিও একই বাসায় গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে।
পুলিশের অভিযোগ, কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা এসব হামলা চালিয়েছেন। ২ জানুয়ারির ঘটনায় বাসার জানালা ও দরজায় গুলি লাগে। এরপর বাসাটিতে পুলিশি পাহারা বসানো হলেও ফেব্রুয়ারিতে আবার গুলি চালানো হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা ডেভিড ইমন ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকায় জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ অন্তত সাতটি মামলার আসামি।
পুলিশের দাবি, ইমন একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতেন এবং অস্ত্র ব্যবহারে দক্ষ ছিলেন। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তার ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
চট্টগ্রামে বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বর্তমানে ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে পুলিশের ভাষ্য। এর আগে এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি বর্তমানে কারাগারে থাকায় ইমন ও রায়হান সক্রিয় ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
রায়হানের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও হত্যাসহ অন্তত আটটি মামলা রয়েছে। পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে প্রায় ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন এবং তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়ে থাকে।
ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের কয়েক দিন আগেই তার দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৬ জুলাই রাতে চট্টগ্রাম নগরের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের ওয়াজেদিয়া এলাকা থেকে বিদেশি পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলিসহ মো. আসিফ ও সাইদুল ইসলাম ওরফে আরিফকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপর যশোরে অভিযান চালিয়ে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হলো। পুলিশ জানিয়েছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যশোর ও চট্টগ্রাম পুলিশের সমন্বয়ে ঝুমঝুমপুর এলাকায় অভিযান চালানো হয়। গ্রেপ্তারের পর তাকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি, হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আলোচনায় থাকা ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তারকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অভিযান হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর তদন্ত ও এসব ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পরবর্তী আইনি কার্যক্রম কী হয়, সেটিই দেখার বিষয়।