সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশে প্রথমবারের মতো ৪ হাজার উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদে সরাসরি নিয়োগের উদ্যোগ এবং এ লক্ষ্যে ৮৩ বছর আগের ‘পুলিশ রেগুলেশন্স অব বেঙ্গল’ (পিআরবি)-এর ৭৪১(বি) বিধি সংশোধনের প্রস্তাবনাটি প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এই চিঠিতে মূলত আধুনিক সাইবার অপরাধ দমন, তদন্তের গুণগত মান উন্নয়ন এবং দক্ষ জনবল সংকটের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় যেন বাহিনীর মাঠ পর্যায়ের দীর্ঘদিনের কর্মকাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ সদস্যদের পদোন্নতির ন্যায্য অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কায় কর্মরকদের। বিশেষজ্ঞদের অভিমত কর্মরত পদোন্নতির পাইপলাইনে থাকা ব্যাক্তিরা যাতে তাদের ন্যার্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। পুলিশ সদর দপ্তরের ভাষ্যমতে, বর্তমানের বহুমাত্রিক অপরাধ এবং সাইবার ক্রাইম মোকাবিলায় কৌশলগত জ্ঞানসম্পন্ন ও প্রযুক্তিগত ভাবে দক্ষ জনবল থাকা অত্যাবশ্যক। সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে মেধাবী ও চৌকস জনবল যুক্ত হলে তা বাহিনীকে আরও জনবান্ধব ও যুগোপযোগী করবে-এ বিষয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, এসআই পদের ৫০ শতাংশ সরাসরি এবং ৫০ শতাংশ বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ হয়ে থাকে। যদি বিধি সংশোধন করে বিভাগীয় কোটা সংকুচিত বা বিলুপ্ত করে সরাসরি নিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে বাহিনীর মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত কনস্টেবল, নায়েক ও এএসআই পদমর্যাদার প্রায় দেড় লক্ষাধিক সদস্যের ক্যারিয়ার সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাঠ পর্যায়ের অনেক সদস্য অভাবের তাড়নায় বা দেশের সেবায় কনস্টেবল পদে যোগ দিলেও তাদের একমাত্র স্বপ্ন থাকে বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে এসআই পদে উন্নীত হওয়া। ১৫-২০ বছর দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এই সদস্যরা যখন দেখেন তাদের পদোন্নতির পথ সংকুচিত হচ্ছে, তখন বাহিনীর চেইন অফ কমান্ড এবং ব্যক্তিগত কর্মস্পৃহায় নেতিবাচক প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। ইতিপূর্বে সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) পদে সরাসরি নিয়োগের বিধান প্রবর্তন করায় মাঠ পর্যায়ে এক ধরনের চাপা অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল। এসআই পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও যদি একই ধরনের সংস্কার আনা হয়, তবে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পেশাদারিত্ব ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আধুনিক সাইবার অপরাধ দমনে দক্ষ জনবল নিয়োগ যেমন সময়ের দাবি, তেমনি মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞ সদস্যদের ক্যারিয়ারের পথ রুদ্ধ করা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংহতির জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। ৪ হাজার এসআই নিয়োগের এই মহতি উদ্যোগকে সফল করতে হলে মেধা ও অভিজ্ঞতার একটি সঠিক সমন্বয় ঘটানো প্রয়োজন। পিআরবি সংশোধনের ক্ষেত্রে কেবল সরাসরি নিয়োগ নয়, বরং বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মেধাবী পুলিশ সদস্যদের যোগ্যতার মূল্যায়ন নিশ্চিত করাই হবে সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত। একটি বৈষম্যহীন ও গতিশীল পুলিশ বাহিনী নিশ্চিত করতে হলে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের আবেগ ও ত্যাগের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে ভাবতে হবে। যেকোনো প্রশাসনিক সংস্কার যেন বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংহতি নষ্ট না করে বরং কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এনটাই প্রত্যাশা করে পদোন্নতির পত্যাশী এসআইগণ।