সরাইলের চাঞ্চল্যকর শিশু ময়না হত্যা, ১০ মাস পরও অধরা খুনি

এফএনএস (মাহবুব খান বাবুল; সরাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া) : | প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:০৪ পিএম
সরাইলের চাঞ্চল্যকর শিশু ময়না হত্যা, ১০ মাস পরও অধরা খুনি

দীর্ঘ ১০ মাস পরও ধরা ছুঁয়ার বাহিরে শিশু ময়নার খুনি। উল্টো হেনস্তা ভয়ভীতি নির্যাতনের শিকার ও ইজ্জত হারিয়ে হতাশ এখন ময়নার পরিবার। তাদের প্রতিটি মুহুর্ত কাটছে উদ্বেগ উৎকন্ঠা আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায়। পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্মকান্ড ও ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ বলছেন ময়নার পিতা প্রবাসী আব্দুর রাজ্জাক। রাজ্জাক বলেন, কেন সাংবাদিককে কিছু বলতে ও সংবাদ সম্মেলন করতে আমাকে বারবার নিষেধ করা হচ্ছে? তার ধারণা ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে অদৃশ্য কোন শক্তির প্রভাবে বন্দি আছে মামলাটি। আব্দুর রাজ্জাকের অভিযোগের তীর এখন মোয়াজ্জিন সাইদুর রহমানের (২১) দিকে। গত ১০ মাসে সবকিছু খুঁইয়ে স্ত্রী দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে অনেকটা দিশেহারা রাজ্জাক। তারপরও মৃত্যুর আগে রাষ্ট্রের কাছে সন্তানের খুনিকে দেখে যাওয়ার আকুতি জানিয়ে সর্বক্ষণ কাঁদছেন ময়নার মা বাবা। খুনি সনাক্ত ও বিচার ধামাচাপা দিতে স্থানীয় একটি চক্রের পাশাপাশি উপরের কোন শক্তির সহায়তার সন্দেহ করছেন রাজ্জাক। ময়নার খুনিরা তার অবশিষ্ট দুই সন্তানকে অপহরণ, হত্যা ও গুম করার শঙ্কায় ভুগছেন তিনি। তাদের বুকফাঁটা আর্তনাদে কাঁপছে সরাইলের শাহবাজপুর গ্রামের ছন্দু মিয়ার পাড়ার আকাশ বাতাস। সরজমিন অনুসন্ধান, মামলা ও নিহত ময়নার পারিবারিক সূত্র জানায়, বাহরাইন প্রবাসী পিতা আব্দুর রাজ্জাকের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তান শিশু মায়মুনা আক্তার ময়নাকে (১০) ধর্ষণের পর নির্মমভাবে খুনের ঘটনার ১০ মাস পেরিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রশাসন চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার খুনিকে সনাক্ত করতে পারেনি। উল্টো বিভিন্ন ধরণের লাঞ্ছনা নির্যাতন চাপ প্রশ্ন ও অপমান অপদস্তের শিকার হচ্ছেন পরিবার। এমন অভিযোগ ময়নার পিতা আব্দুর রাজ্জাকের। রাজ্জাক জানান,  এ পর্যন্ত ঘটনায় জড়িত সন্দেহে বাড়ির পাশের মসজিদের ইমাম মাওলানা হামিদুর রহমান (৪০) ও মোয়াজ্জিন মো. সাইদুর রহমানকে (২১) গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠিয়েছেন পুলিশ। এ ছাড়া আর উল্লেযোগ্য কোন অগ্রগতি নেই মামলার। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদেরকে ৫ দিনের রিমান্ডও মঞ্জুর করেছিলেন আদালত। দীর্ঘ প্রায় ৮ মাস কারাভোগের পর গত ১১ ই মার্চ জামিনে এসেছেন তারা। এর আগে তাদেরকে নির্দোষ বলে জামিন করাতে আমাকে কেন চাপ দিলেন স্থানীয় মসজিদ কমিটি মুসল্লিসহ দেশের অনেক বড় বড় নেতা? এ জন্য রাজ্জাককে ধর্ম উপদেষ্টার কার্যালয় পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজ্জাক। সেখানে ক্যামেরা দিয়ে তার বক্তব্য রেকর্ড করার চেষ্টাও করা হয়েছে। রাজ্জাকের দাবী- এই ঘটনা মোয়াজ্জিনই ঘটিয়েছে। প্রকৃত খুনি মোয়াজ্জিনই।  ইমাম হয়ত তাকে সহযোগিতা করেছে। সে আমার মেয়েকে (ময়নাকে) আদর করতো। মোয়াজ্জিনকে দেখলেই আমার রক্ত টগবগ করত। মোয়াজ্জিনের সহযোগি কারা তা এখনো কেন প্রশাসন বের করতে পারছেন না? ইমামের ডিএনএ টেষ্টের জন্য বিছানার ছাদরসহ পড়নের আগে পরের ১৫-১৬টি কাপড় নিল। আর মোয়াজ্জিনের শুধু পড়নের ২টি কাপড় নিল কেন? আরো কাপড় নিলেন না কেন? ডিএনএ রিপোর্টে মোয়াজ্জিনের সাথে ইমামের নাম ঠিক আছে। কিন্তু পরে অনেক জায়গায় মোয়াজ্জিনের নামের সাথে উদয়ুজ্জামানের নাম আনল কেন? এ গুলো প্রশাসনের ব্যর্থতা। মোয়াজ্জিন কেন রাতে মসজিদের দ্বিতীয়তলার ফ্লোর সিঁড়ি ও নিজের কক্ষ ধৌঁত করল? রাত ৪টার সময় একটি সিএনজি মসজিদের সামনে আসছিল লাশটা নিয়ে যেতে। ওই সিএনজির চালককে পুলিশ হয়ত সনাক্ত করতে পেরেছেন। কিন্তু তা প্রকাশ করছেন না কেন প্রশাসন। প্রশাসন আসলে কোন বা কারো চাপের মধ্যে আছে? তারা শুধু আমাকে চাপ দিচ্ছেন। প্রশাসন আমাকে বলেন, তুমি আল্লাহ আল্লাহ কর। আরেকজন বলে, তুমি ঘরে গিয়ে খুঁজ। আবার আরেকজন বলে, তুমি সাংবাদিকের কাছে যেউ না। নিউজ করাইও না। সাংবাদিক সম্মেলন করিও না। দিন শেষে কথা একটাই- ধর্ষণকারী ও খুনিকে বাঁচাতে গিয়ে এক শ্রেণির মানুষ সম্মিলিতভাবে ময়নার মা বাবার উপর যে চাপ সৃষ্টি করছেন। আর এ জন্যই আজও অধরা শিশু ময়নার ধর্ষণকারী ও খুনিরা। আমি আমার স্ত্রী, চাচাত ভাইসহ অনেককে পুলিশ নিয়ে আলাদা ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। অনেককে টর্চার করেছেন। শাররীক ভাবে নির্যাতন করেছেন। এর অর্থ কী? তাদের কাছ থেকে তো তারা কিছুই পাননি। নিহত ময়নার বাবা আব্দুর রাজ্জাক ও মা লিপা আক্তার বলেন, নিরপরাধ মানুষ দুনিয়াতে বেঁচে থাকা কঠিন। সন্তান হত্যা করল। ইজ্জত মারল। বিদেশের চাকরী গেল। ১০টা মাস প্রশাসন আইন ও মানুষের পিছে ঘুরলাম। কিছুই হলো না। খুনিরা এখনো বহাল তবিয়তে ধরা ছুঁয়ার বাহিরে। ফাঁকে অপপ্রচার ও হেনস্তার শিকার হইলাম। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে খুবই টেনশনে ও নিরাপত্তাহীনতায় আছি। তাদেরকে ২৪ ঘন্টা পাহাড়া দিতে হয়। কারণ খুনি চক্র আমরাসহ তাদেরকে অপহরণ খুন গুম করে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। ঘটনার পর কত নেতানেত্রী শান্তনা দিল। এখন আর কেউ পাত্তা দেয় না। আল্লাহ যেন মৃত্যুর আগে আমাদের ময়নার খুনিকে দেখার ভাগ্য দেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্রামের একাধিক ব্যক্তি বলেন, ঘটনাটির পেছনে বড় কোন ঘটনা থাকতে পারে। ময়নাদের আশপাশের প্রভাব প্রতিপত্তিশালী ২/১ জন লোক জড়িত থাকার বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকান্ড ও মামলাটিকে ধামাচাপা দিতে মোটা অংকের টাকা ভাগ বন্টনের বিষয়টিও চাউর হচ্ছে। মেয়াজ্জিন মো. সাইদুর রহমান বলেন, আমার বিরূদ্ধে করা সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি এই ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানি না। ইমাম মাওলানা হামিদুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে আমি শতভাগ নির্দোষ। কারণ ঘটনার দিনে ও সময়ে আমি এখানে উপস্থিতই ছিলাম না। বেহুদা ৮টি মাস কারাভোগ করলাম। এটা হয়ত অল্লাহর ইচ্ছা।   মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ব্রাহ্মণবাড়িয়া পিবিআই’র পুলিশ পরিদর্শক বেলাল উদ্দিন বলেন, আমরা খুনি সনাক্তে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এই পর্যন্ত ২২ জনের ডিএনএ টেষ্ট করেছি। আরো কিছু লোকের টেষ্ট করব। কাজ করছি। খুনি অবশ্যই বের হবে। সময় লাগতে পারে। ময়নার পিতার অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, সকল অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি মোয়াজ্জিনকে বা অন্য কাউকেও সন্দেহ করতে পারেন। আমরা নিশ্চিত হয়ে আইনি ব্যবস্থা নিব। তদন্ত চলমান আছে। তদন্তের স্বার্থে আমাদেরকে অনেক ধরণের কাজ করতে হচ্ছে। প্রসঙ্গত: ২০২৫ সালের ৫ জুলাই শনিবার বাড়ির পাশে খেলতে গিয়ে নিখুঁজ হয় শাহবাজপুর লতিফ মোস্তারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী ময়না। পরের দিন ৬ জুলাই রোববার ভোরে বাড়ির পাশের মসজিদের দ্বিতীয়তলায় বিবস্র অবস্থায় মিলে ময়নার মরদেহ। ৭ জুলাই সোমবার ময়নার মা লিপা আক্তার বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে (শিশু ধর্ষণ ও খুন) সরাইল থানায় একটি মামলা করেন। কিছুদিন পরই মামলাটি চল যায় জেলা পিবিআই-এর কাছে। ঘটনার ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো সনাক্ত হয়নি খুনি চক্র।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে