রাজশাহীতে বস্তার সংকট, দ্বিগুণ দাম ও সময় মত অনেক কৃষক কোল্ড স্টোরেজ (হিমাগারে) আলু সংরক্ষণ করতে পারেননি। তাই বাধ্য হয়ে ঘরে-বাইরে খোলা জায়গায় অনেকে জমির পাশে আলু স্তূপ করে রাখেন। বর্তমানে হাট বাজারে দাম নেই। বিক্রয় করতে না পেয়ে প্রচন্ড গরমে স্তূপেই পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আলু। ফলে পচন ধরা আলু ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দিচ্ছেন কৃষকেরা। বর্তমানে ডায়মন্ড আলু (সাদা) ১১ টাকা ১২ টাকা, ইস্টিক আলু (লাল) ১০ থেকে ১১ টাকা কেজি বিক্রয় হচ্ছে। প্রতি বিঘাতে লোকসান হচ্ছে ২২ হাজার থেকে ২৩ হাজার টাকা। লোকসানের কারণে ঋণের পাল্লা ভারী হওয়ায় এখন কৃষকরা বেশ দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এ অবস্থায় কোন ধরনের পরামর্শ না পাওয়ার অভিযোগও করেন তারা।
চলতি মৌসুমে খেত থেকে আলু তোলার সময় লোকসানের মুখে পড়েন চাষীরা। জমিতে শুরু হয় কম দামে আলু বিক্রি। দাম বেড়ে ১৬ টাকা কেজি আলু জমিতে বিক্রি হয়েছিল। ওই সময় হঠাৎ করে বস্তার সংকট সৃষ্টি হয়। বস্তার দাম বেড়ে যায় দ্বিগুণেরও বেশি। চরম আকার ধারণ করেছে বস্তাসংকট। এর প্রভাব পড়েছে আলুর দামে। বস্তার দাম বেশি হওয়ায় দুই থেকে তিনদিনের মধ্যে আলুর দাম কেজিকে ৩ টাকা কমে ১৩ টাকায় নেমে আসে। তবু ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছিল না। বস্তার অভাবে আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করতে না পেয়ে বাড়ির পাশে, আম বাগানে খোলা জায়গায় আলু স্তূপ করে রাখেন চাষিরা। সেখানেই প্রচন্ড গরমে কারণে পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্নের আলু।
চাষি ও ব্যবসায়ীরা বলেন, গত বছর যে বস্তার দাম ছিল ৭৫ থেকে ৮০ টাকা। এবার সেই বস্তা বিক্রি শেষ পর্যন্ত বিক্রয় হয় ১৮০ টাকা ২০০ টাকায়। এ নিয়ে আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে পড়েন। তাঁদের অভিযোগ, হিমাগার মালিকেরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বস্তার দাম বাড়ানো হয়েছিল।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর রাজশাহীতে আলু চাষ হয়েছিল ৩৮ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৫ হাজার হেক্টর; কিন্তু চাষ হয়েছে ৩৪ হাজার ২৮০ হেক্টরে।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার চোরখৈর গ্রামের আলুচাষি আতাউর রহমান এবার পৌনে চার বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। ফলন ভালো হয়েছে তাঁর। ওই সময় এক ব্যবসায়ী ১৫ টাকা কেজি দাম বলেছিল। পরদিন তাঁর আলু নিতে আসার কথা ছিল। কিন্তু ওই ব্যবসায়ী জানিয়ে দেয়, বস্তাসংকটের কারণে আলু নিতে আসতে পারছি না। তারপর বাড়ির পাশে স্তূপ করে আলু। প্রচন্ড গরমে আলু পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে আলু দাম সাড়ে ১১ টাকা থেকে ১২ টাকা কেজি।
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার মেলান্দী গ্রামের কৃষক আবু হেলা বলেন, তিনি এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। এখন পর্যন্ত তিনি আলু বিক্রি করতে পারেননি। স্তূপে আলু পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আলু নিয়ে চরম বিপাকে রয়েছেন।
রাজশাহীর রহমান কোল্ডস্টোরেজের মহাব্যবস্থাপক আবদুল হালিম বলেন, ‘এবার আলুর বস্তার মহাসংকট দেখা দেয়। গতবার যারা বস্তা বানিয়েছিল, সব বিক্রি হয় নাই। সেই আতঙ্কে এবার তারা বাড়তি বস্তা উৎপাদন করে নাই। যে কারণে আলু তোলার সময় বস্তার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল।। এবার আলু কেনার ক্রেতা বেশি ছিল । দাম কম তাই চাহিদা বেশি। কিন্তু ব্যাংকে টাকা থাকলেই আলু কেনা যায় না। আলু কেনার জন্য বস্তার প্রয়োজন। বস্তার অনেকে আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করতে পারেনি।
রাজশাহীর তানোরের আলুচাষি ও ব্যবসায়ী রানা চৌধুরী বলেন, গত বছর ৭৫ থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে বস্তা পাওয়া গিয়েছিল। এ বছর মৌসুমের শুরু থেকেই ১২০ টাকা করে বস্তা কিনতে হয়েছে। ঈদের এক দিন পর ১৬০ টাকা করে বস্তা কিনতে হয়। বস্তার অভাবে অনেকে আলু কিনতে পারেননি।
রাজশাহীর মোহনপুরে মেসার্স আশিক ট্রেডার্স এর প্রোপেটার আলু ব্যবসায়ী মো: শরিফুল ইসলাম বলেন, কোল্ড স্টোরেজ খোলা হবে চলতি বৈশাখ মাসের শেষে। আমি প্রতিদিন ৫/৬ গাড়ী আলু ক্রয় করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মোকামে পাঠানো হচ্ছে। এখনো রাজশাহী অঞ্চলে কৃষকের ঘরে-বাইরে খোলা জায়গায় যে পরিমাণ আলু রয়েছে। কোল্ড স্টোরেজ (হিমাগার) খোলার আগে শেষ হবে না।