বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভোজ্যতেলের বাজার স্থিতিশীল রাখার জোরালো আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে রাজশাহী মহানগরসহ উপজেলা পর্যায়ে হাট- বাজার গুলোতে সয়াবিন তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা পৌঁছেছে চরমে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীদের দফায় দফায় বৈঠকের পরও সয়াবিন তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরছে না। উল্টো কয়েক দিন ধরে রাজশাহী অঞ্চলের হাট-বাজার গুলোতে বোতলজাত সয়াবিন তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে খোলা সয়াবিন তেলের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাজশাহী মহানগরীর ভদ্রা, সাগরপাড়া, সাহেব বাজার, কোর্ট বাজার, শালবাগান, নওদাপাড়া বাজার, উপজেলা পর্যায়ে পবার নওহাটা, তানোরের গোল্লাপাড়া বাজার, মোহনপুরে কেশরহাট, বাগমারার ভবানীগঞ্জ, তাহেরপুর বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই। বিশেষ করে ৫ লিটারের বোতল বাজার থেকে প্রায় উধাও হয়ে গেছে। কোন কোন বাজারে ১ লিটার, হাফ লিটার ও ২ লিটারের বোতল পাওয়া গেলেও তা চাহিদার তুলনায় অতি সামান্য। হাট-বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, খুচরা পর্যায়ে অধিকাংশ দোকান থেকে উধাও ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল। হাফ, এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলও সব দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকটি দোকান ঘুরে তেল পাওয়া গেলেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে। খোলা তেল কিনতে হলেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। বাজারে খোলা সয়াবিন সাধারণত কেজি ও লিটার দুভাবেই বিক্রি হয়।দেখা গেছে, বাজারভেদে খুচরা পর্যায়ে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল ২০০ থেকে ২১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। একইভাবে খোলা পাম তেলের দাম প্রতি লিটার ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েক দিন ধরেই এরকম অবস্থা বিরাজ করছে হাট-বাজারে।
এদিকে, বাজারে এখন সরকার নির্ধারিত ৫ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৯৫৫ টাকা। সেটি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। ২ লিটার ৩৯০ টাকা, বিক্রয় হচ্ছে ৪১০ টাকা লিটার, এক লিটার ১৯৫ টাকা, বিক্রির হচ্ছে ২১০ টাকা। হাফ লিটার তেলে বোতল বিক্রয় হচ্ছে ১১০ টাকায়। কিন্তু সরকারের নির্ধারিত এই দামে বাজারে তেল মিলছে না।
নগরীর শালবাগান সবজি বাজারের খুচরা ব্যাবসায়ী আশরাফুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে তার দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই। তিনি জানান, অর্ডার দেওয়া থাকলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের বড় তেল কোম্পানি গুলো দাম বাড়াতে আগ্রহী হলেও সরকার তাতে সম্মতি না দেওয়ায় তারা সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এ জন্য খোলা তেল বিক্রি করছে অনেক ব্যবসায়ীরা।
তিনি আরও বলেন, দাম বাড়ার খবর শুনলে অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে রাখেন, ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট আরও বেড়ে যায়।
একজন তেল বিক্রয়কর্মী বলেন, বাজারে এখন বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই বললেই চলে। আমরা খুব কম তেল পাচ্ছি, যা পাচ্ছি তা এক বেলাতেই শেষ হয়ে যায়। সরবরাহ না থাকায় খোলা তেল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।
ভদ্রার খুচরা ব্যবসায়ী এনামুল হক বলেন, কোম্পানির কাছে অর্ডার দিয়েও তারা তেল পাচ্ছেন না। এমনকি কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা বাজারে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। দাম বাড়ার আশায় কোম্পানি গুলো বাজারে তেল ছাড়া বন্ধ রেখেছে। .
খুচরা বিক্রেতারা জানান, কোম্পানির লোক কয়েক দিন ধরে আসছে না। বাজারে গুঞ্জন রয়েছে, দাম না বাড়লে তারা তেল ছাড়বে না। এই কৃত্রিম সংকটের কারণে পাইকারি বাজারে খোলা তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের বাড়তি দরেই তা কিনতে হচ্ছে।
এদিকে বাজারে তেলের এমন হাহাকারে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ক্রেতারা। বাজারে তেল কিনতে আসা জাহিদুল ইসলাম নামের এক চাকুরীজীবি বলেন, টিভিতে শুনলাম তেলের দাম বাড়বে না, সরবরাহ ঠিক থাকবে। কিন্তু বাজারে এসে দেখি বোতলজাত তেল নেই। বাধ্য হয়ে ২১০ টাকা কেজি দরে খোলা তেল কিনতে হচ্ছে। অপর ক্রেতা আলমগীর অভিযোগ করেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা যোগসাজশ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। সরকারের উচিত কেবল বৈঠক না করে বাজার তদারকিতে কঠোর হওয়া।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা সংগঠন ক্যাবের রাজশাহী মহানগরের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন বলেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী মুনাফা লোভী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। অন্যথায় এ সংকট যেমন বাড়বে, সে সাথে ভোগান্তিতে পড়তে হবে সাধারণ ভোক্তাদের।