রাজশাহীর তানোরে নিজ বাড়িতে থাকা সাব মার্সেবল পাম্প থেকে সেচ দিয়ে বাড়ির পার্শ্বের পতিত জমিতে কেউ চাষ করেছেন সবজি চাষ কেউ বা রসুন, পেঁয়াজ। অনেক কৃষক সরিষা, মুসুর, আলু উঠানোর পরে কেউ বা ১০ কাঠা থেকে শুরু করে ৫ বিঘা পর্যন্ত করেছেন বোরো চাষ। আর এসব ফসল চাষই যেন রাজশাহীর তানোর উপজেলার কৃষকের গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি তানোর জোনাল অফিস ফেব্রুয়ারী ও মার্চ মাসের বিলের সাথে ফসলে সেচ দেয়ার অপরাধে কৃষক প্রতি অতিরিক্ত ১ হাজার ৫শ' টাকা করে জরিমানা যুক্ত করেছেন।
ভুক্তভোগী কৃষকরা বলছেন, তানোর উপজেলার কয়েক হাজার কৃষককে এমন জরিমানা করে আদায় করা হচ্ছে
কোটি। কৃষকরা বলছেন, আলু, পেয়াজ আর রসুনের মতো চাষবাদ গুলোতে কৃষকরা টানা ২ বছর ধরে লোকশান গুনছেন। পল্লী বিদ্যুতের বাড়তি জরিমানার বোঝা টানতে গিয়ে অনেক কৃষক ফসলের লাভের চেয়ে এবছরও লোকসানের মধ্যে পড়েছেন। এতে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের উপর ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠছেন কৃষকরা। অনেকে ফসল চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। তাই আগামীতে কমে যেতে পারে সবজিসহ অন্য ফসল চাষ। বর্তমান সরকার কৃষক বান্ধব। সরকারের শুরুতেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি লোন মাফ করেছেন।
অল্প সময়ে এসে কৃষকের জন্য কৃষক কার্ডসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছেন সরকার যা কৃষকেরা ইতি মধ্যে সুফল পেতে শুরু করেছেন। এমন সময় পল্লী বিদ্যুতের অতিরিক্ত জরিমানার বোঝা একদিকে কৃষকের লোকশানের বোঝা বাড়াচ্ছে অন্যদিকে কৃষি কাজে ব্যাঘাতও ঘটছে। তানোর উপজেলার কৃষকরা আলু,ধান, মসুর, সরিষা উৎপাদন করে দেশে খাদ্য ঘাটতি পূরণে কয়েক দশক ধরে ভূমিকা রাখছেন। তানোর উপজেলায় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কতৃপক্ষ (বিএমডিএ) গভীর নলকুপে পানি কম উঠায় এবং অনেক গভীর নলকুপ ভূগর্ভস্থ পানি সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে।
এতে পানির অভাবে হাজার হাজার বিঘা জমি পতিত পড়ে থাকছে। বিশেষ করে বাড়ির আশে পাশে সবজি ও ফলের বাগান গুলোতে বাড়িতে বসানো সাব মার্সেবল পাম্প দিয়ে অল্প পরিসরে সেচ দিয়ে কৃষকরা চাষবাদ করছেন। আর এ চাষ করতে গিয়েই বিপাকে পড়ছেন কৃষকরা। তানোর জোনাল পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের তথ্য মতে, তানোর উপজেলায় প্রায় ৫১ হাজারেরও বেশি আবাসিক ও বাণিজ্যিকসহ প্রায় ৫৬ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। প্রায় প্রতিটি পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে স্থাপন করা সাব মার্সেবল পাম্প দিয়ে কৃসকরা ফসল উৎপাদন করেন। অনেকে আবার মাঠের জমিতেও পাম্প স্থাপন করে সেচ দিচ্ছেন।
তানোর উপজেলা মুন্ডুমালা পৌর এলাকার পাঁচন্দর বাগমারাপাড়ার সামিরুল ইসলাম বাবু তার গ্রাহক হিসাব নং ১০৪৯০৪৫২৮১০৩৫। তার ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে সাধারণ বিলের সাথে ১ হাজার ৫শ' টাকা করে দুই মাসে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করে ৬ হাজার ২৩৪ টাকা বিল পাঠিয়েছেন পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। পরপর দুই মাসের এমন বিল হাতে পেয়ে কৃষক সামিরুল চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।
কৃষক সামিরুল ইসলাম বাবু জানান, বাড়ি পাশে ১৫ শতকের একটি জমি ছিল তার। জমির পাশে গ্রামে একটি বড় মসজিদের ওজুখানা পানি গিয়ে এমনিতেই পানি জমে থাকে।
সেখানে তিনি চলতি বছর বোরো ধান রোপন করেছেন।
বাড়িতে বসানো সাব মার্সেবল পাম্প দিয়ে তিনি কয়েক ঘন্টা সেচ দিয়েছেন। এতে তার বিলের সঙ্গে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে ১ হাজার ৫শ' টাকা করে দুই মাসে ৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত জরিমানা করা হয়েছে। কৃষক সামিরুল ইসলাম বাবুর মতো তানোর উপজেলায় কয়েক হাজার কৃষক ১ হাজার ৫শ' টাকা করে বাড়তি জরিমানা বিল নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি তানোর জোনাল অফিসের সহকারী ব্যবস্থাপক (ডিজিএম) রেজাউল করিম খান বলেন, কৃষি বিভাগসহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সভা করে বোরোর জমিতে গভীর নলকুপ ছাড়া মটর পাম্পে সেচ না দেয়ার সিন্ধান্তের ভিত্তিতে রোবো চাষবাদ শুরুর আগে মটর পাম্পে কৃষকদের সেচ না দিতে এলাকায় এলাকায় মাইকিং করে প্রচারণা চালানো হয়েছিলো। তারপরও কৃষকরা জমিতে সেচ দিয়েছেন এজন্যই জরিমানা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ৫৬ হাজার গ্রাহকের মধ্যে জমিতে সেচ দেয়ার অপরাধে মার্চ মাসে ৭শ' ৩৫ জন গ্রাহক (কৃষককে) ১ হাজার ৫শ'' টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। যদি কোন কৃষক অফিসে এসে আর সেচ দিবেনা এই মর্মে লিখিত দেন তাহলে আর জরিমারা করা হবেনা বলেও জানান তিনি।
তানোর উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহম্মেদ বলেন, জমিতে সেচ দেয়ায় এতো গুলো কৃষককে জরিমানা করার বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে, বিষয়টি দ্রত সমাধান করার ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ তানোর জোনের সহকারী প্রকৌশলী নাইমুল ইসলাম বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বিএমডিএ'র এরিয়ার মধ্যেই অনুমোদনহীন এসব অবৈধ মটারে সংযোগ দিয়েছে যা নীতি বহির্ভূত। এসব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করে জরিমানা আদায় করা হচ্ছে কার সার্থে এমন প্রশ্নও রাখেন তিনি। তিনি বলেন যত্রতত্র যেখানে সেখানে কেউ মটার স্থাপন করলেই পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ রহস্য জনক কারনে সংযোগ দিয়ে দিচ্ছেন। পানির অপচয়ের কারনে দিন দিন পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি। এসবের জন্য পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ কোন ভাবেই দায় এড়াতে পারেননা বলেও জানান তিনি।