টানা ১৪ ঘন্টা বিদ্যুৎ বিহীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল। মঙ্গলবার এখানে অনেক মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর ভরসা ছিল চার্জার লাইট আর প্রকৃতির আলো। সকাল ৭/৮টার দিকে একাধিক কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব ও দায়িত্বরতরা পরীক্ষার্থীদের চার্জার লাইট নিয়ে কেন্দ্রে আসার বিষয়টি নিশ্চিত করতে ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মুঠোফোনে নির্দেশও দিয়েছেন। সকালের ভারী বর্ষণ আর ঝড়ে চরম দূর্ভোগ পোহাতে হয়েছে পরীক্ষার্থীদের। বৃষ্টির কারণে অনেক পরীক্ষার্থীর পড়নের কাপড় ভিজে যাওয়ায় শীতে জবুতবু হতে দেখা গেছে। স্থানীয় পিডিবি বলছেন, আগের রাতে কুট্রাপাড়া এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙ্গে পড়ায় এই বিভ্রাট।
ভুক্তভোগি পরীক্ষার্থী ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহেরও অধিক সময় ধরে সরাইলে দিনেরাতে প্রায় ৮-১০ ঘন্টা লোডশেডিং দিচ্ছেন স্থানীয় পিডিবি। আবার কখনো ১০/১৫/২০/৩০ মিনিট পরপর বিদ্যুৎ যাচ্ছে আর আসছে। বিশেষ করে নামাজের জামায়াত দাঁড়ানোর সাথে সাথেই চলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ। নামাজ শেষ হলে আবার আসছে। এমন ঘটনায় খুবই বিব্রত সরাইল সদরের মুসল্লিরা। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার যাওয়া-আসা নাটকের ফাঁকে দিবাগত রাত ৩টার দিকে চলে যায় বিদ্যুৎ। আর আসেনি। বিকাল ৫টা পর্যন্ত সরাইল সদর, কালীকচ্ছ, নোয়াগাঁও, শাহবাজপুর, শাহজাদাপুর, চুন্টা, পানিশ্বরের কোথাও ও পাকশিমুলের ইউনিয়নের একাংশে বিদ্যুৎ ছিল না। গতকাল সকালে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে চারিদিক গভীর অন্ধকার হয়ে যায়। চিন্তিত হয়ে পড়েন এসএসসি পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। পরীক্ষার্থীরা যখন কেন্দ্রে আসবে ঠিক সেই সময় সকাল ৯টায় শুরূ হয় প্রবল বর্ষণ। সাথে হালকা ঝড়। চরম দূর্ভোগে পড়ে যায় পরীক্ষার্থীরা। বিদ্যুৎহীনতার কথা ভেবে অনেক অভিভাবকই পরীক্ষার্থীদের অন্ধকারের ভরসা হিসাবে চার্জার লাইট দিয়ে দেন। অনেক পরীক্ষার্থীকেই বৃষ্টিতে ভিজে শীতে কাঁপতে কাঁপতে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেখা যায়। সকাল ১০টা থেকে পরীক্ষা শুরূ হলেও সরাইলের কেন্দ্র ও ভ্যেনুসহ ৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৫টিতেই ছিল না বিদ্যুৎ। ইংরেজী দ্বিতীয় পত্রের পুরো পরীক্ষার ৩ ঘন্টার মধ্যে আর বিদ্যুৎ আসেনি। অনেক পরীক্ষার্থী অন্ধকার দূর করতে চার্জার লাইট জ্বালিয়ে পরীক্ষা দিয়েছেন। আর অনেকের ভরসা ছিল প্রকৃতির আলো (ফর্সা)। বিশেষ করে ভকেশনাল পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্র এম.এ বাশার আইডিয়াল ইন্সটিটিউট এর ১২৪ জন পরীক্ষার্থীর অনেকেই চার্জার লাইট জ্বালিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শিক্ষক নাজমা বেগম। দেওড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ইউনুছুল হক বলেন, কেন্দ্র সচিব মোহাম্মদ আলী পরীক্ষার্থীদের চার্জার লাইট ও ছাতা নিয়ে কেন্দ্রে আসার বিষয়টি নিশ্চিত করতে আমাকে মুঠোফোনে বলেছেন। আমি বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষকের সহায়তায় ৯০ জন পরীক্ষার্থীকে বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছি। একাধিক অভিভাবক জানান, শাহবাজপুর স্কুলের সহকারী শিক্ষক এমডি নজরূল ইসলাম চার্জার জ্বালিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার একটি চিত্র ফেসবুকে ষ্ট্যাটাসও দিয়েছিলেন। অজানা কারণে কতক্ষণ পর তিনি সেই ষ্ট্যাটাসটি আবার ডিলিট করে ফেলেন। ওই কেন্দ্রের বাণিজ্য বিভাগের পরীক্ষার্থী সাধন খান ও বিজ্ঞান বিভাগের সাফিন বলেন, অন্ধকার কক্ষে আমাদেরকে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়েছেন স্যাররা। অনেকে চার্জার লাইট নিয়ে গেছে। এভাবেই পরীক্ষা দিয়েছি। এ বিষয়ে কেন্দ্র সচিব মোহাম্মদ আলীকে মুঠোফোনে (০১৭১২-৪১৭১৯৯) একাধিকবার ফোন দিলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। অন্নদা স্কুল সংলগ্ন নতুন ভবন কেন্দ্রে মাদ্রাসার ৭৭ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছে। সেখানেও ছিল না বিদ্যুৎ। অন্নদা স্কুল কেন্দ্রের বাণিজ্য বিভাগের পরীক্ষার্থী মীর উমর ফারূকের বাবা আবুল কাশেম বলেন, কি করব? ছেলেকে চার্জার লাইট দিয়ে কেন্দ্রে পাঠিয়েছি। উপজেলা মাধ্যমিক কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জীবন ভট্রাচার্য্য বলেন, অনেক কক্ষেই মোমবাতি চার্জার দিয়েছি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় হওয়ায় অনেক কক্ষই খোলামেলা ও দিনের আলো ছিল। খুব বেশী অন্ধকার হয়নি। আমরা বৃষ্টির মধ্যেই ভিজে কেন্দ্রে কেন্দ্রে গিয়েছি। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় উপজেলা সদরের শতশত পরিবার পানির সংকটে কষ্ট করছেন। খাবার পানির জন্য অনেকেই অন্যের বাড়িতে দৌঁড়াতে দেখা গেছে। অনেক নারী পুরূষ গোসল করেননি। ফ্রিজে রক্ষিত কাঁচা তরিতরকারি ফলমূল নষ্ট হয়েছে। পূর্ব ঘোষণায় গতকাল সকাল ১০ টা থেকে সরাইলে গ্যাসও ছিল না। তাই গ্যাস আর বিদ্যুৎহীনতায় সরাইলের মানুষের জীবন গতকাল দূর্বিসহ হয়ে উঠেছিল। বিদ্যুতের বিষয়ে জানতে সরাইল পিডিবি’র নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আহমেদ বলেন, একাধিকবার ফোন দিলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে ফেসবুকের মাধ্যমে জানা যায় সোমবার গভীররাতে কুট্রাপাড়া মোড় এলাকায় বিদ্যুতের একটি খুঁটি ভেঙ্গে পড়ে যাওয়ায় সমস্যা হয়েছে।