টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের আতঙ্কে যখন বিপর্যস্ত ছিল হাওরাঞ্চল, ঠিক তখনই সোমবার সকালের ঝলমলে রোদ যেন নতুন প্রাণ ফিরিয়ে দিল সুনামগঞ্জের কৃষক-কৃষাণীদের মনে। রোদের দেখা পেয়ে ভোর থেকেই ধান শুকানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। সদর উপজেলার নিয়ামতগ্রামে গিয়ে দেখা যায়-খলায় খলায় শুকোতে দেওয়া ধান, আর সেই ধান বাঁচাতে পরিবারের সবাই মিলে নিরলস পরিশ্রম। শুধু বড়রা নন, স্কুলপড়ুয়া শিশুরাও নেমেছে কাজে। মাহমুদুল হক (৬) ও মেরাজুল হক (৪) নামে দুই শিশুকে দেখা যায় ধানের বস্তার ওপর বসে থাকতে-পিতা-মাতার সঙ্গে তারাও যেন কৃষিযুদ্ধের ছোট সৈনিক।
খলায় গিয়ে দেখা যায়, কেউ ধান উড়াচ্ছেন, কেউ ভেজা ধান সরিয়ে রোদে দিচ্ছেন, আবার কেউ শুকনো ধান বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। বিজন বিহারী দাস, আব্দুজ জহুর, কাজল রানী দাস, ফাহিমা বেগম ও প্রতিমা রানী দাস-সবার মুখেই ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তার ছাপ।
বিজন বিহারী দাস বলেন, এখনো অনেক জমি পানির নিচে রয়েছে। সোমবার রোদ ওঠায় খলায় ধান শুকানোর কাজ করছেন তারা। ঘরে থাকা ভেজা ধান যতটা সম্ভব শুকানোর চেষ্টা চলছে। তবে তার অভিযোগ, প্রকৃত ক্ষতির সঙ্গে সরকারের নির্ধারিত হিসাবের কোনো মিল নেই। তিনি দাবি জানান, সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও কৃষক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব নির্ধারণ করা হোক।
জহুর আলী জানান, পানির নিচে থাকা ধান আর তোলা সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। ধান কাটার শ্রমিকরাও কাজ করতে রাজি হচ্ছেন না। তারা ধান কাটার বিনিময়ে অর্ধেক ফসল দাবি করছেন, যা কৃষকদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাহিমা বেগম বলেন, তার ১০ কেয়ার জমির মধ্যে মাত্র ৫ কেয়ার ধান কাটতে পেরেছেন, বাকি অংশ এখনো পানির নিচে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি সহায়তার কথা শুনে স্থানীয় মেম্বারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানানো হয়, তালিকাভুক্তির সময় ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও সহায়তা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি। একই ধরনের অভিযোগ করেন গৌরারং ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য প্রতিমা রানী দাস। তিনি বলেন, শ্রমিকদের অর্ধেক ধান দিতে হলে নৌকা ভাড়া ও মাড়াই খরচই উঠবে না। তাই এমন পরিস্থিতিতে পানির নিচে থাকা ধান না তুলেই ছেড়ে দেওয়াই ভালো বলে মনে করছেন তিনি। ধান রক্ষায় খলায় অস্থায়ী খুপরি ঘর তৈরি করে রাতেও পাহারা দিচ্ছেন কৃষকরা। তবুও চুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। কাজল রানী দাস জানান, গত রাতে খলা থেকে একজনের ধান চুরি হয়েছে। এতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। খলা থেকে বাড়ির দূরত্ব বেশি হওয়ায় প্রতিদিন ধান আনা-নেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। এত অভিযোগ-অনুযোগের মাঝেও রোদের দেখা পাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে কৃষক-কৃষাণীদের মাঝে। তারা বলছেন, কোনোভাবে যদি সারা বছরের খাবারের ধান ঘরে তোলা যায়, সেটাই তাদের জন্য বড় প্রাপ্তি।
সুরঞ্জিত দাস জানান, দেড় কেদার জমির ধান মাড়াই করে সব মিলিয়ে ১০ মণের মতো হবে। এরপরও ধান মাড়াই করতে হচ্ছে, কারণ নিজের ও গবাদিপশুর জন্য অন্তত কিছু খাদ্য জোগাড় করা জরুরি। এত অভিযোগ-অনুযোগের মধ্যেও রোদের দেখা পেয়ে খানিকটা স্বস্তি ফিরেছে কৃষকদের মনে। তারা বলছেন, “সারা বছরের খাবার যদি কোনোভাবে ঘরে তুলতে পারি, সেটাই বড় পাওয়া।”
এদিকে জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ২৬ হাজার ৪৭৯ জন কৃষকের ক্ষতির তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ১২৫ কোটি টাকা। কৃষি বিভাগের হিসাবে, জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার ১৬০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত এবং সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে ২ হাজার ৪৭ হেক্টর জমির ফসল।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “রোদ উঠা কৃষকদের জন্য স্বস্তির খবর। এভাবে কয়েকদিন রোদ থাকলে বাকি ধান ঘরে তোলা সম্ভব হবে।” তবে তিনি জানান, চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নির্ধারণে আরও সময় লাগবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পূর্বাভাস বলছে, সুনামগঞ্জে এখনো বন্যার শঙ্কা রয়েছে। আগামী দুই দিনে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনাও রয়েছে।