দীর্ঘদিনের অভিযোগ, আন্দোলন ও পরিবেশবাদীদের দাবির মুখে অবশেষে মহেশখালীর সোনাদিয়া দ্বীপ এলাকায় বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছে প্রশাসন। শনিবার (৯ মে) সকাল থেকে শুরু হওয়া এ অভিযানে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষিত দ্বীপটির বন বিভাগের খাসজমি ও সংরক্ষিত উপকূলীয় এলাকা দখল করে গড়ে তোলা অসংখ্য অবৈধ কটেজ, ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
প্রশাসনের দাবি, আদালতের নির্দেশনা, পরিবেশ আইন এবং বন বিভাগের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পর্যটন ব্যবসার আড়ালে সোনাদিয়া দ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে আসছিল। এতে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য, ম্যানগ্রোভ বন ও সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। শনিবার সকাল থেকেই দ্বীপজুড়ে অবস্থান নেয় প্রশাসনের যৌথ বাহিনী। অভিযানে নেতৃত্ব দেয় মহেশখালী উপজেলা প্রশাসন। এ সময় নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, বন বিভাগ ও আনসার বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়। পুরো এলাকা নিরাপত্তা বলয়ে ঘিরে ধাপে ধাপে উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হয়। অভিযান চলাকালে দেখা যায়, ম্যানগ্রোভ বন কেটে এবং বালুচর দখল করে নির্মাণ করা কাঠের বিলাসবহুল কটেজ, বাঁশ-টিনের রিসোর্ট, পর্যটক শেড, রেস্টুরেন্ট ও ক্যাফে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। কোথাও বুলডোজার, কোথাও শ্রমিকদের হাতুড়ির আঘাতে মুহূর্তেই ধসে পড়ে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনাগুলো। অনেক মালিককে নিজেরাই আসবাবপত্র, জেনারেটর, ফ্রিজ ও অন্যান্য সরঞ্জাম সরিয়ে নিতে দেখা যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে অপরিকল্পিত পর্যটনের বিস্তারের সুযোগে স্থানীয় ও বহিরাগত কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি সরকারি জমি দখল করে একের পর এক কটেজ ও রিসোর্ট নির্মাণ করেন। অভিযোগ রয়েছে, দালাল চক্রের মাধ্যমে সরকারি জমি বিক্রির নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমিদ ডালিম গণমাধ্যমকে বলেন, সোনাদিয়া দ্বীপ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। এখানে যেকোনো ধরনের স্থায়ী কিংবা অস্থায়ী বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ আইনত নিষিদ্ধ। কিছু অসাধু ব্যক্তি পরিবেশ আইন অমান্য করে দ্বীপটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছিল। সোনাদিয়াকে তার আদি রূপে ফিরিয়ে আনতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। দখলদার যত প্রভাবশালীই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযানের নেতৃত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু জাফর মজুমদার বলেন, অনেক বিনিয়োগকারী স্থানীয় দালালদের খপ্পরে পড়ে সরকারি জমি কিনে অবৈধ কটেজ নির্মাণ করেছেন। এসব স্থাপনার তালিকা করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হবে। পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের অবস্থান জিরো টলারেন্স। বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক কাছিমের গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত সোনাদিয়া দ্বীপ বাংলাদেশের উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের অন্যতম আশ্রয়স্থল। প্রতি বছর শীত মৌসুমে এখানে বিরল প্রজাতির পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে। বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ বন, প্রাকৃতিক বালুচর ও লবণাক্ত জলাভূমির কারণে আন্তর্জাতিকভাবেও দ্বীপটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তবে গত কয়েক বছরে অপরিকল্পিত পর্যটন, বাণিজ্যিক চিংড়ি ঘের, বন উজাড় ও অবৈধ কটেজ নির্মাণের কারণে দ্বীপটির পরিবেশ ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়ে। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত আনাগোনা, রাতভর উচ্চশব্দে গান-বাজনা এবং কৃত্রিম আলোকসজ্জার কারণে সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছিল। পাশাপাশি প্লাস্টিক বর্জ্য, জেনারেটরের তেল এবং বনাঞ্চলের গাছ কেটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের ফলে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছিল দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতে, এ উচ্ছেদ অভিযান শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; বরং প্রকৃতি রক্ষার দীর্ঘ আন্দোলনের একটি বড় সাফল্য। তাদের ভাষ্য, কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে সোনাদিয়া আবারও তার হারানো জীববৈচিত্র্য ফিরে পেতে পারে। স্থানীয় কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামাল বলেন, অনেকে যদি বলে আমারও কটেজ আছে, তাহলে সবার আগে আমার কটেজ গুঁড়িয়ে দাও। সোনাদিয়া রক্ষা করা সবার আগে জরুরি। তবে স্থানীয়দের একাংশের মধ্যে ভবিষ্যৎ জীবিকা নিয়ে উদ্বেগও দেখা দিয়েছে। কারণ, অনেক পরিবার পর্যটন সংশ্লিষ্ট ছোটখাটো ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে উচ্ছেদের পর কর্মসংস্থান সংকটের আশঙ্কা করছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ আবদুল্লাহ বলেন, “উচ্ছেদ অবশ্যই দরকার ছিল। কিন্তু এখানকার মানুষের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থাও করতে হবে। পরিবেশবান্ধব ও অনুমোদিত পর্যটন ব্যবস্থা না থাকলে অনেক বেকার যুবক আবার অপরাধের পথে জড়িয়ে পড়তে পারে।”
সচেতন মহলের দাবি, শুধু একদিনের অভিযান দিয়ে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অতীতেও কয়েকবার উচ্ছেদ হলেও নজরদারি কমে গেলে পুনরায় দখল শুরু হয়েছে। তাই উদ্ধারকৃত জমিতে স্থায়ী বিট অফিস স্থাপন, নিয়মিত টহল ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। পরিবেশ বিশ্লেষকদের মতে, সোনাদিয়া দ্বীপ শুধু একটি পর্যটন এলাকা নয়; এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। তাই দ্বীপটিকে রক্ষা করা জাতীয় স্বার্থের অংশ। আজকের এই সাঁড়াশি অভিযান অবৈধ দখলদারদের জন্য কঠোর বার্তা হয়ে এসেছে। এখন সময় এসেছে সোনাদিয়াকে পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটন অঞ্চলে রূপান্তর করার-যেখানে প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, দুটিই সমান গুরুত্ব পাবে।