রাজশাহী বিভাগে পুরো দেশের তুলনায় কোরবানিযোগ্য পশু বেশি

এম এম মামুন; রাজশাহী | প্রকাশ: ১২ মে, ২০২৬, ১২:০৮ পিএম
রাজশাহী বিভাগে পুরো দেশের তুলনায় কোরবানিযোগ্য পশু বেশি
কোরবানিযোগ্য সবচেয়ে বেশি গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া রয়েছে রাজশাহী বিভাগে। এর পরই রয়েছে চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কোরবানিযোগ্য গবাদি পশুর সংখ্যা বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া গেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, ঈদুল আজহায় এবার কোরবানিযোগ্য গবাদি পশুর মোট সংখ্যা এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতেই মন্ত্রণালয় এ সংখ্যা জানিয়েছেন।অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুরো দেশের এসব কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে রাজশাহী বিভাগেই রয়েছে ১৪ লাখ ২৮ হাজার ২৭৪টি গরু ও মহিষ। ঈদকে সামনে রেখে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। আর এই প্রস্তুতিতে পিছিয়ে নেই রাজশাহী বিভাগ। এবার দেশে কোরবানিযোগ্য পশু বেশি রয়েছে এই বিভাগে। এদিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, কোববানির পশুকে অধিক লাভের আশায় দ্রুত মোটাতাজাকরণের ইনজেকশন বা অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খামারিরা বলছেন, এ বছর খাবারের দাম বেশি থাকায় পশু পালনে ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। তাই সে অনুযায়ী পশুর দাম না পেলে লোকসানের আশঙ্কা আছে। রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় কোরবানিযোগ্য পশু আছে ৪৩ লাখ ৫ হাজার ৬২৮টি। চাহিদা আছে ২৪ লাখ ২৫ হাজার ৮৯ টি। উদ্বৃত্ত থাকবে ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৫৩৯টি। বিভাগের দুই লাখ ২৪ হাজার ৪৮৩টি ছোট ও বড় খামারে কোরবানিযোগ্য পশুর লালন পালন করা হয়েছে। বিভাগে মোট ৩০২টি হাটে এবার পশু কেনাবেচা করা হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, রাজশাহী জেলায় খামার আছে ২৬ হাজার ২৩৪টি। এর মধ্যে গরু আছে এক লাখ চার হাজার ৮৪১টি, ছাগল আছে তিন লাখ ১১ হাজার ৩৩৯টি ও ভেড়া আছে ৪৩ হাজার ৪০৬টি। চার লাখ ৬৩ হাজার পশু থাকলেও চাহিদা তিন লাখ ৭১ হাজার। নাটোর জেলায় খামার আছে ২০ হাজার ৩৭৪টি। এর মধ্যে গরু আছে এক লাখ ১৮ হাজার ৫০৫টি, ছাগল তিন লাখ ২০ হাজার ৩৭১টি ও ভেড়া আছে ৩৪ হাজার ৩৮টি। চার লাখ ৭৫ হাজার পশু থাকলেও চাহিদা দুই লাখ ৭৪ হাজার ৬১১টি। নওগাঁ জেলায় খামার আছে ৩৮ হাজার ৯০৯টি। এর মধ্যে গরু আছে দুই লাখ ১১টি, ছাগল আছে পাঁচ লাখ ১৪ হাজার ৮৪০টি ও ভেড়া আছে ৮০ হাজার ১৩৯টি। ৭ লাখ ৯৭ হাজার ৫১৫টি পশু থাকলেও চাহিদা আছে তিন লাখ ৮৬ হাজার ৮৩৭টি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় খামার আছে ১৩ হাজার ৯৪২টি। এর মধ্যে গরু আছে এক লাখ ১৭ হাজার ১০টি, ছাগল ৮৪ হাজার ৮০১টি ও ভেড়া আছে ১২ হাজার ৯২২টি। দুই লাখ ১৫ হাজার ২৪৪টি পশু থাকলেও চাহিদা আছে এক লাখ ২১ হাজার ২০২টি। পাবনা জেলায় খামার আছে ৩৩ হাজার ৪০টি। এর মধ্যে গরু আছে দুই লাখ ছয় হাজার ৪০৫টি, ছাগল আছে তিন লাখ ৭৯ হাজার ১৭৭টি ও ভেড়া আছে ৬২ হাজার ৩৮৫টি। ছয় লাখ ৫৩ হাজার ৫৮৮ পশু থাকলেও চাহিদা আছে তিন লাখ ৩৬ হাজার ৫৭২টি। সিরাজগঞ্জ জেলায় খামার আছে ১৭ হাজার ৬৮টি। এর মধ্যে গরু আছে এক লাখ ৯৯ হাজার ৯২৪টি, ছাগল আছে তিন লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০টি ও ভেড়া আছে ৪৭ হাজার ৭২৪টি। ছয় লাখ ১৭ হাজার ৭২৩টি পশু থাকলেও চাহিদা আছে দুই লাখ ৯৩ হাজার ৬৭৬টি। বগুড়া জেলায় খামার আছে ৫১ হাজার ৭৬৪টি। এর মধ্যে গরু আছে তিন লাখ ২০ হাজার ৭৮৪টি, ছাগল আছে তিন লাখ ৮৫ হাজার ৫৬৯টি ও ভেড়া আছে ৪৮ হাজার ২৯টি। সাত লাখ ৫৬ হাজার ৫৩৭টি পশু থাকলেও চাহিদা আছে চার লাখ ৪৭ হাজার ৫৮০টি। জয়পুরহাট জেলায় খামার আছে ২৩ হাজার ১৫২টি। এর মধ্যে গরু আছে এক লাখ ৩৯ হাজার ৯৫৪টি, ছাগল এক লাখ ৩৬ হাজার ২৯১টি ও ভেড়া আছে ৫০ হাজার ৯০টি। তিন লাখ ২৬ হাজার ৫৭৩টি পশু থাকলেও চাহিদা আছে দুই লাখ তিন হাজার ৫৫৩টি।এবার কোরবানির পশুর সরবরাহ নিয়ে কোনও সংকট থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চাহিদার চেয়ে বেশি পশুর মজুত আছে। স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী ২৪ লাখ পশু রেখে বাকি ১৮ লাখ দেশের অন্যান্য জেলায় পাঠানো হবে। তবে খামারিরা খরচ অনুযায়ী পশুর দাম না পাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। খামার মালিক ও ক্ষুদ্র চাষিরা বলছেন, খাবারের দাম বেশি থাকায় পশু পালনে তাঁরা হিমশিম খাচ্ছেন। সে অনুযায়ী পশুর দাম না থাকলে তাঁদের লোকসানে পড়তে হবে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছেন ক্ষুদ্র খামারিরা। রাজশাহী জেলার দামকুড়া থানার খামারি আবদুল্লাহ জানান, তাঁর পাঁচটি গরু আছে কোরবানির ঈদে বিক্রির জন্য। তাঁর প্রত্যাশা প্রতিটি গরু দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করবেন। কিন্তু ১ লাখ ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার ওপরে কেউ দাম বলছে না। খামারিরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস ধরেই তারা পশু মোটাতাজাকরণ, পরিচর্যা ও বাজারজাতের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। প্রাকৃতিক উপায়ে পশু লালনপালনে এবার বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। বাজারে পশুর চাহিদা ভালো থাকলে তারা ন্যায্য দাম পাবেন। এখন রাজশাহী বিভাগের সব জেলাতেই বাড়ি বাড়ি গরু-ছাগল পালন করা হয় বাণিজ্যিকভাবে। অনেকেই নতুন করে খামার গড়ে তুলেছেন। কোরবানির জন্য বাইরের গরু-ছাগলের চাহিদা প্রায় শূন্যের কোটায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি খামারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থানও হয়েছে বলে জানিয়েছেন খামারিরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অতিরিক্ত পশু রাজধানীসহ দেশের অন্য অঞ্চলের চাহিদা মেটাতে সহায়ক হবে। শুধু রাজশাহী জেলা নয়, পুরো বিভাগজুড়েই পশুর সরবরাহ আশাব্যঞ্জক।একসময় সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের হাটগুলোতে ভারতীয় গরুর আধিপত্য ছিল। তবে সীমান্তে কঠোর নজরদারির কারণে গত কয়েক বছরে সেই প্রবণতা বন্ধ হয়েছে। এতে স্থানীয়ভাবে গবাদিপশু পালনে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। জানা গেছে, রাজশাহী বিভাগজুড়ে তিন শতাধিক কোরবানির হাট বসানোর প্রস্তুতি প্রায় শেষ। কিছু এলাকায় বেচাকেনা শুরু হয়েছে। তবে ঈদের কয়েক দিন আগে এসব হাটে ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের ভিড়ে জমজমাট বেচাকেনা শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার খামারি আব্দুল মালেক জানান, তিনি আগেভাগেই দেশীয় পদ্ধতিতে পশু লালন-পালন শুরু করেন। যদিও উৎপাদন খরচ বেড়েছে, তবুও ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন তিনি। রাজশাহীর তানোর উপজেলার সুজন আলী বলেন, ছয় মাস আগে পরিকল্পনা করে গরু পালন শুরু করি। প্রথমে খাদ্যের দাম নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ ছিল। বর্তমানে পশুগুলো ভালোভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। বাজারে ভালো দাম পাবো বলে আশা করছি। পবা উপজেলার খামারি রফিকুল ইসলাম জানান, নিজস্ব খামারে দেশীয় পদ্ধতিতে পশু লালনপালন করেছেন। তবে এ বছর গো-খাদ্য ও ওষুধের দাম কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় খরচ বেশি পড়েছে। তারপরও তিনি আশা করছেন, কোরবানির বাজারে পশুর ভালো চাহিদা থাকবে। ফলে দামও পাওয়া যাবে ভালো। পবা উপজেলার খামারি আবদুল কাদের বলেন, এবার আমরা আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়েছি। দেশীয় পদ্ধতিতে পশু পালন করেছি। পশু পালনে আমাদের খরচও বেড়েছে, তাই বাজারে যেন ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায়, সেটাই প্রত্যাশা। দুর্গাপুর উপজেলার খামারি জহরুল ইসলাম বলেন, কোরবানি পশু পালন করেন বড় একটা আয়ের সুযোগ হয়। এবার আমার ১২টি গরু আছে। যেগুলো ঢাকার হাটে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করবো। আমার বাড়ির পাশে খামার। এই খামারে বছরজুড়ে গবাদিপশু লালনপালন করা হয়। প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা সবুজ ঘাস খাইয়ে এখানকার পশু মোটাতাজা করা হয়। এতে গরু দেখতেও সুন্দর হয়। এসজে পদ্মা অ্যাগ্রোর স্বত্বাধিকারী মেহরাব হোসেন বলেন, কোরবানিতে বিক্রির জন্য শতাধিক গরু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বিক্রি করা হয়েছে। আমাদের সব পশু খামার থেকেই বিক্রি হয়ে থাকে। এখান থেকে কোনও পশু হাটে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা হয় না। ক্রেতারা খামারে আসেন। নিজের মতো দেখেন, পছন্দ করেন এরপর কিনে নিয়ে যান। রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতোয়ার রহমান বলেন, আগের বছরের মতো এবারও দেশীয় পশু দিয়েই কোরবানির চাহিদা পূরণ হবে। অতিরিক্ত পশু দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা গেলে খামারিরা আর্থিকভাবে লাভবান হবে। খামারিরা লাভবান হলে তারা গরু পালনে আরও ব্যাপক উৎসাহী হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক ডা. আনন্দ কুমার অধিকারী বলেন, রাজশাহীতে বিগত কয়েক বছর থেকে দেশি পশু দিয়েই কোরবানির চাহিদা পূরণ হচ্ছে। এবারও রাজশাহীতে চাহিদার তুলনায় বাড়তি পশু রয়েছে। গত বছরের তুলনায় দুই শতাংশ চাহিদা বেড়েছে। এই পশু শুধু বিভাগের জন্য না। ঢাকা ও চট্টগ্রামেও বিক্রি করা হয়ে থাকে। সেখান থেকেও ব্যবসায়ীরা এসে কিনে নিয়ে যায়। আশা করা যায় এবার চাহিদার বেশি পশু বিক্রি হবে। তিনি আরও বলেন, হাটগুলোতে ভেটেরিনারি সেবা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হবে। অতিরিক্ত পশু দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহের জন্য খামারিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
আপনার জেলার সংবাদ পড়তে