রাষ্ট্র পরিচালনায় কার্যকর আইনব্যবস্থা একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সমাজ, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির রূপ বদলায়; সেই বাস্তবতায় আইনকেও যুগোপযোগী হতে হয়। এ লক্ষ্যেই বাংলাদেশে ১৯৯৬ সালে আইন কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় তিন দশক পর এসে প্রশ্ন উঠেছে-এই কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবে কতটা কাজে লাগছে? পত্রপত্রিকার তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে আইন কমিশন ১৬৯টি আইনের সংস্কার বা নতুন আইন প্রণয়নের সুপারিশ করলেও বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র আটটি। অর্থাৎ দীর্ঘ গবেষণা, বিশেষজ্ঞ মতামত, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের পরও অধিকাংশ সুপারিশ ফাইলবন্দি হয়ে রয়েছে। এতে শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ই নয়, আইন সংস্কারের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন আইনি কাঠামো নির্মাণে ব্যস্ত, বাংলাদেশ তখনো অনেক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ আমলের আইন নিয়ে এগোচ্ছে। সাক্ষী সুরক্ষা, মিথ্যা মামলা প্রতিরোধ, চিকিৎসায় অবহেলা, বৈষম্য বিলোপ কিংবা বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার রোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আইন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকৃত হতে পারত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব সুপারিশের অগ্রগতি সম্পর্কেও অনেক সময় কমিশনকে জানানো হয় না। এ পরিস্থিতির পেছনে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কমিশনে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কোনো কমিশন যদি ক্ষমতাসীন সরকারের স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে না পারে, তবে তার সুপারিশও কার্যকর রাজনৈতিক গুরুত্ব পায় না। একইসঙ্গে বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার বা বিতর্কিত আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কমিশনের নীরবতাও জনআস্থাকে দুর্বল করেছে। তবে শুধু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপই নয়, আইনি বাধ্যবাধকতার অভাবও একটি বড় কারণ। বর্তমানে আইন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকার বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওপর কার্যকর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশও বছরের পর বছর অনিষ্পন্ন থেকে যায়। উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, কার্যকর আইন কমিশনের জন্য প্রয়োজন স্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং সুপারিশ বাস্তবায়নের বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে আইন কমিশনকে কার্যকর করতে হলে কমিশনের সুপারিশ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংসদে উত্থাপন বা বাস্তবায়নের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা জরুরি। পাশাপাশি কমিশনে নিয়োগে পেশাগত দক্ষতা ও নিরপেক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্যথায় আইন সংস্কারের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান কেবল কাগুজে গবেষণা আর রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের প্রতীক হয়েই থেকে যাবে।