বর্তমান বাংলাদেশে খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো নৃশংস ঘটনার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব ঘটনার বিচার দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিবাদ দেখা গেলেও কিছুদিন পরই তা নতুন ঘটনার আড়ালে হারিয়ে যায়। ফলে অনেক হৃদয়বিদারক ঘটনার স্মৃতি ধীরে ধীরে মানুষের মন থেকে মুছে যেতে থাকে। এমন বাস্তবতায় রাজশাহীর তানোর উপজেলার এক তরুণ ব্যতিক্রমি এক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, যা একদিকে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ, অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষারও একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার কলমা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ভালুকাকান্দর গ্রামের বাসিন্দা মো. গোলাম রাব্বানী (গোলাপ) দীর্ঘদিন ধরে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করে আসছেন। সম্প্রতি তিনি দেশে আলোচিত বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে গাছ রোপণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।
তিনি জানান, সমাজে ঘটে যাওয়া অন্যায় ও নির্মম ঘটনাগুলো যেন মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে না যায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। সেই চিন্তা থেকেই তিনি এই উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন। তার বিশ্বাস, একটি গাছ যেমন বছরের পর বছর মানুষের উপকার করে, তেমনি এসব গাছও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতনতার প্রতীক হয়ে থাকবে।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিনি ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক তোফাজ্জল হোসেনের স্মরণে একটি গাছ রোপণ করেছেন। এছাড়াও ২০২৬ সালের ১৯ মে রাজধানী ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার শিকার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারের স্মরণে আরেকটি গাছ রোপণ করেছেন।
তবে, শুধু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর স্মরণেই নয়, প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ২০১২ সালে তিনি সুকচানের বাড়ি থেকে ফুলবাড়ী এলাকার রিপনের বাড়ি পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ছয়শরও বেশি তালগাছ রোপণ করেন। এছাড়াও তানোর মসজিদ থেকে পাঠাকাটা মোড় পর্যন্ত সড়কে নিম, জাম, তেঁতুল ও পলাশ গাছ লাগিয়েছেন। পাঠাকাটা থেকে দুবইল সাহাপুর সড়ক পর্যন্ত নিম, জাম ও আমগাছ রোপণ করেছেন। শুধু নিজ এলাকা নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানেও তিনি জলপাই, মেহগনি, কৃষ্ণচূড়া, হিপিলিপ, বট, পাকুড়সহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। তার লাগানো অনেক গাছ ইতোমধ্যেই বড় হয়ে মানুষের ছায়া, অঙ্েিজন এবং পরিবেশগত উপকার নিশ্চিত করছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, একটি প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণের এমন উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। তার এই কাজ অন্য তরুণদেরও সামাজিক ও পরিবেশগত দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করবে।
এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা হাফিজুল ইসলাম বলেন, “গোলাপ ভাইয়ের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। আজ যে গাছগুলো লাগানো হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেগুলো মানুষকে ছায়া দেবে, অঙ্েিজন দেবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে এসব গাছ আমাদের সমাজে ঘটে যাওয়া হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর স্মৃতিও বহন করবে।”
আরেক স্থানীয় তরুণ মেহেদী হাসান বলেন, “গোলাপের কাজ আসলেই পরিবেশবান্ধব ও মানবিক। ব্যক্তিগত উদ্যোগে এত বছর ধরে গাছ লাগিয়ে যাওয়া সহজ বিষয় নয়। আমি তার জন্য দোয়া করি, তিনি যেন আরও বেশি গাছ লাগিয়ে আমাদের এলাকাসহ দেশকে সবুজে ভরিয়ে তুলতে পারেন।”
সচেতন মহলের মতে- যখন পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সামাজিক অবক্ষয় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন মো. গোলাম রাব্বানী (গোলাপ)-এর মতো তরুণদের এমন উদ্যোগ সমাজে আশার আলো দেখায়। তার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি, মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেওয়ারও অনন্য উদাহরণ।