প্রায় দুই যুগ পরে ভরাট হয়ে যাওয়া পূর্ব সুন্দরবনের আড়ুয়াবেড় ও খড়মা খাল পুনঃখননের ফলে ফিরেছে জোয়ার ভাটার তীব্র স্পন্দন। অবশেষে প্রাণ ফিরে পেয়েছে শরণখোলার ধানসাগর ইউনিয়নের রাজাপুর এলাকার সংযোগ খালগুলো। এ খালে পানি দেখে সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল জেলে-মৎস্যজীবীরা আনন্দ-উচ্ছ্বাস করছে। সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এক বছর মেয়াদে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে খাল দুটি পুনঃখনন করেছে। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই যুগ আগে পলি জমে ভরাট হয়ে সরু খালে পরিণত হয় সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর ফরেস্ট স্টেশন অফিস ও শরণখোলা উপজেলার রাজাপুর গ্রাম সংলগ্ন আড়ুয়াবেড় এবং চাঁদপাই রেঞ্জের আওতাধীন সংযোগকারী খড়মা খাল। খাল দুটিতে জোয়ার ভাটার স্রোত ছিল না। নৌযান চলাচল করতে পারত না। জেলে ও মৎস্যজীবীরা জীবিকার টানে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে জালের বোঝা মাথায় করে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কষ্ট করে ৮/১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে পথ পায়ে হেঁটে শ্যালা নদীতে মাছ ধরতে যেত। খাল ভরাট হওয়ার কারণে যাতায়াত সুবিধা না থাকায় জেলেরা ধানসাগর স্টেশনে তেমন পাস-পারমিট নিত না। দুই যুগ পরে খাল দুটিতে জোয়ার ভাটার পানি প্রবাহিত হওয়ায় জেলে-মৎস্যজীবীদের মাঝে খুশির আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। সুন্দরবন সংলগ্ন শরণখোলার উত্তর রাজাপুর গ্রামের জেলে রুবেল হাওলাদার, মালেক ব্যাপারী, পশ্চিম রাজাপুর গ্রামের জেলে আঃ সোবহান ও মৌয়ালী খলিল হাওলাদারসহ অনেকে বলেন, এক সময়ের খরস্রোতা আড়ুয়াবেড় ও খড়মা খাল দুই যুগ আগে ভরাট হয়ে যায়। নৌকা ও ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে যেতে পারতাম না। বাধ্য হয়ে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ৮/১০ কিলোমিটার পথ হেঁটে শেলা নদীতে মাছ ধরতে যেতাম। এখন খাল দুটি পুনঃখনন করায় খালে আবার জোয়ার ভাটার প্রবাহ শুরু হয়েছে। আমরা আবার আগের মতো সহজেই সুন্দরবনের নদী ও খালে মাছ ধরতে যেতে পারব বলে জানালেন ঐ জেলেরা। পরিবেশবিদদের মতে, এ পুনঃখনন সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানের জন্য ইতিবাচক। খালে সর্বক্ষণিক পানি থাকায় শুষ্ক মৌসুমে বনের ভেতর অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি যেমন কমবে, তেমনি পানির তীব্র স্রোতের কারণে বাঘ ও বন্য শূকরের লোকালয়ে প্রবেশের আশঙ্কা হ্রাস পাবে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বাগেরহাটের নবাগত নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত পাল বলেন, সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় পূর্ব সুন্দরবনের ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে আড়ুয়াবেড় খাল এবং ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে খড়মা খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। আড়ুয়াবেড় খাল সুন্দরবনের ধানসাগর স্টেশন থেকে শুরু হয়ে শেলা নদীতে মিশেছে এবং খড়মা খাল জিউধারার বড়ইতলা থেকে শুরু হয়ে একইভাবে শেলা নদীতে গিয়ে মিশেছে। খাল দুটি খননে সময় লেগেছে এক বছর এবং এতে ১২ কোটি ৭৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে বলে নির্বাহী প্রকৌশলী জানান। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, দুই যুগ যাবত ভরাট হয়ে থাকা আড়ুয়াবেড় ও খড়মা খাল পুনঃখনন করে গত ৯ মে খাল দুটির মুখ খুলে দেওয়া হয়েছে। খালে এখন প্রবল বেগে জোয়ার ভাটার স্রোত বইছে। খাল দুটি খনন হওয়ায় এক দিকে জেলে-মৎস্যজীবীদের দুর্ভোগ লাঘব হয়েছে, অন্যদিকে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীদের লোকালয়ে প্রবেশের পথ রুদ্ধ হয়েছে। তা ছাড়া নদীতে সার্বক্ষণিক পানি থাকায় সুন্দরবনে আগুনের প্রবণতা অনেকাংশে কমে যাবে; প্রাণ ফিরে পেয়েছে জীববৈচিত্র্য।