কফিনে ফিরলেন লেবাননে নিহত সাতক্ষীরার দুই প্রবাসী

এফএনএস (এস.এম. শহিদুল ইসলাম; সাতক্ষীরা) : | প্রকাশ: ৭ জুন, ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম
কফিনে ফিরলেন লেবাননে নিহত সাতক্ষীরার দুই প্রবাসী

জীবিকার তাগিদে দেশ ছেড়েছিলেন। বুকভরা স্বপ্ন ছিল, পরিবারকে একটু সুখে রাখবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন মাঝপথেই কেড়ে নিল ইসরায়েলি ড্রোন। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে কফিনবন্দি হয়ে নিজ ভূমে ফিরলেন লেবাননে নিহত সাতক্ষীরার দুই রেমিট্যান্স যোদ্ধা শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলাম। রবিবার (৭ জুন) সকালে দুই প্রবাসীর মরদেহ তাদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্বজনদের বুকফাটা কান্না আর আহাজারিতে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো এলাকা। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে প্রতিবেশীদের চোখের জলেও।

এর আগে, শনিবার (৬ জুন) গভীর রাতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় দুই প্রবাসীর মরদেহ। সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। রবিবার জোহরের নামাজ শেষে নিজ নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়।

গত ১১ মে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়ে অঞ্চলের জিবদিন এলাকায় নিজ বাসভবনে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম (৪০) এবং আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের নাহিদুল ইসলাম (২০)। প্রায় এক মাস পর সরকারি ব্যবস্থাপনায় তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হলো। শফিকুল ইসলামের মৃত্যুতে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে তার পরিবার। তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী রুমা খাতুন এবং দুই কন্যাসন্তানকে রেখে চিরবিদায় নেওয়া শফিকুলের অনুপস্থিতিতে পরিবারটি এখন ঘোর অনিশ্চয়তার মুখে। তাঁর বড় মেয়ে মৌ আক্তার বিজ্ঞান বিভাগের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। বাবার এমন আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকারের মুখোমুখি।

ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মিঠু বলেন, “শফিকুলের উপার্জনেই পুরো পরিবার চলত। তাঁর অকালমৃত্যুতে পরিবারটি চরম সংকটে পড়েছে। দুই মেয়ের জীবন গঠন ও পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সরকারের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন।” প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার, খুলনার সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. খালেদুর রহমান জানান, মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরেই দাফন-কাফন বাবদ স্বজনদের হাতে ৩৫ হাজার টাকার চেক তুলে দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, নিহতরা বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে ৩ লাখ টাকা এবং জীবনবিমা বাবদ ১০ লাখ টাকা প্রদান করা হবে। ফলে নিহত শফিকুল ও নাহিদুলের পরিবার নিয়ম অনুযায়ী মোট ১৩ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবে। একই হামলায় আহত প্রবাসী শুভজিতের পরিবারও এই সহায়তা পাবে। তবে সহায়তার এই অর্থ হয়তো সাময়িক অভাব ঘোচাবে, কিন্তু দুই পরিবারের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। যে মানুষগুলো পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে মরুভূমির তপ্ত রোদ আর যুদ্ধক্ষেত্রের আতঙ্ক মাথায় নিয়ে লড়ে যাচ্ছিলেন, তারা আজ লাশ হয়ে ফিরলেন। তাদের এই নির্মম বিদায় শুধু দুই পরিবারেই নয়, পুরো সাতক্ষীরা জেলায় নামিয়ে এনেছে গভীর শোকের ছায়া।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে