চাঁদপুরের মেঘনা নদী বিধৌত হাইমচর উপজেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পর্যটন ও কর্মসংস্থানের জন্য এক অপার সম্ভাবনার জনপদ। মেঘনার চরাঞ্চলের অপরূপ দৃশ্য, শীতকালীন অতিথি পাখি, এবং প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইকোনমিক জোন) স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবনমান উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে।
চাঁদপুর জেলা শহরের পুরাণবাজার থেকে দক্ষিনে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে মেঘনা নদীর তীরঘেঁষা একটি গ্রামীণ জনপদের নাম হাইমচর উপজেলা। এক সময় নদীভাঙ্গন ও চরাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই জনপদ এখন নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছে। বিস্তীর্ণ পানের বরজ, সবুজ কৃষিজমি, সুপারির বাগান, মেঘনায় রুপালি ইলিশ ধরাসহ নদীর মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং উন্নত সড়ক ও নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা, সব মিলিয়ে হাইমচর পর্যটন, কৃষি, শিল্প ও কর্মসংস্থানের একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চলে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও উন্নয়ন-সংশ্লিষ্টরা। হাইমচর উপজেলাটি ৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে ৩টি ইউনিয়ন মেঘনা নদীর পশ্চিম পাড় অর্থাৎ চরাঞ্চলে অবস্থিত। মেঘনার পূর্ব পাড়ে রয়েছে ৩টি ইউনিয়ন। এর মধ্যে আলগী উত্তর ইউনিয়নের কাটাখালি থেকে দক্ষিণ ইউনিয়নের চরভাঙ্গা গ্রাম পর্যন্ত মেঘনা নদীর পাড়ে রয়েছে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার সম্ভাবনাময় স্থান। শুধুমাত্র একটি মেরিন ড্রাইভ, খাবার ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারলে কর্মসংস্থান হবে অসংখ্য বেকারের। বিনিয়োগের জন্য এগিয়ে আসবেন অনেক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি।
দেশের যদি সত্যিকার অর্থে উন্নয়ন করতে হয়, তাহলে অবশ্যই গ্রামীণ পর্যায়ের উন্নয়ন সবার আগে দরকার। গ্রামই হতে পারে পর্যটন শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ, মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপন পদ্ধতি, উদ্ভিদ, বিভিন্ন পাখি, নদী,ঝিল, বিভিন্ন ধরনের আচার- অনুষ্ঠান, গ্রামীণ পেশা, খেলাধুলা, প্রাচীন বৃক্ষ,মৎস্য আহরণ এসবই হবে পর্যটকদের মনের খোরাক।এর সব কিছুই হাইমচরে রয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, মেঘনার পাড়ে চরভাঙ্গা নামক স্থানে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে স্কাউটের ৬ষ্ঠ বার্ষিক জাতীয় অনুষ্ঠান ‘কমডেকা’ যোগদান করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি চরাঞ্চলে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মেঘনা পাড়ে মেরিন ড্রাইভ করার ঘোষণা দেন।
মেঘনা নদীর কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা হাইমচরের প্রাকৃতিক পরিবেশ বছরের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। মেঘনা পাড়, চরাঞ্চলের উন্মুক্ত প্রকৃতি, সবুজ কৃষিজমি এবং পানের বরজ এ জনপদকে অন্যরকম সৌন্দর্য দিয়েছে। একইসাথে ব্যবসার মূল উৎসও বটে। পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের নতুন গন্তব্য হিসেবে হাইমচর পরিচিতি লাভ করতে পারে।
কৃষি,মৎস্য অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি : হাইমচরের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি ও মৎস্য।আরো আছে গবাদি পশু। এখানে মেঘানার ইলিশ, চরাঞ্চলের গবাদি পশু, কৃষিপণ্য ধান, গম, মরিচ, শাকসবজিসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল, পান ও সুপারির উৎপাদন উল্লেখযোগ্য। কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে কৃষকের আয় বাড়বে এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ ঘটবে।এতে স্থানীয় তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত হতে পারে হাইমচর মধ্যচর : স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি, মধ্যচরে সরকারের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইকোনমিক জোন) দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক। এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ও সেবাখাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ : হাইমচরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে নদীতীরবর্তী পর্যটন কেন্দ্র, বিনোদন পার্ক, ইকো-রিসোর্ট, নৌ-ভ্রমণ এবং পারিবারিক অবকাশযাপনের স্থান গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। মেঘনা নদীর তীরে একটি আধুনিক মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ করা গেলে এটি শুধু পর্যটকদের আকর্ষণই বাড়াবে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন গতি সঞ্চার করবে।
অবকাঠামো উন্নয়ন সময়ের দাবি : এলাকাবাসীর মতে, হাইমচরের সার্বিক উন্নয়নের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা একান্ত জরুরি। এর মধ্যে রয়েছ-
হাইমচরকে পৌরসভায় উন্নীত করা, জেলা শহর থেকে হাইমচর উপজেলা সদর পর্যন্ত দুই লেনবিশিষ্ট সড়ক নির্মাণ, একটি আধুনিক স্টেডিয়াম নির্মাণ, পর্যটনকেন্দ্র ও শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য পরিকল্পিত ভূমি উন্নয়ন। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, যোগাযোগের উন্নয়ন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সহজ হবে।
জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন : হাইমচরের স্বাস্থ্য সেবা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নও অত্যন্ত জরুরি। এলাকাবাসীর দাবি, হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৫০ শয্যা বিশিষ্ট ভবনের নির্মাণ কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি ১০০ শয্যা হাসপাতালে রুপান্তর, অবকাঠামো আরো উন্নয়ন, চরাঞ্চলের মানুষের দ্রুত ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে নিয়মিত স্পিডবোট সার্ভিস চালু করা এবং চরাঞ্চলে একটি সরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা খুবই প্রয়োজন।
সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এখনই সময় : বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি, যোগাযোগব্যবস্থা এবং ভৌগোলিক অবস্থান-সব দিক থেকেই হাইমচর একটি সম্ভাবনাময় উপজেলা। সঠিক পরিকল্পনা, টেকসই অবকাঠামো উন্নয়ন, নদী ভাঙ্গনরোধে টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ,পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে হাইমচর আগামী দিনে চাঁদপুর জেলার অন্যতম পর্যটন, শিল্প ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
সরকার গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য দূরীকরণের দিকে যথাযথ নজর দিলে
এতে শুধু স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নত হবে না, জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এই গ্রামীণ জনপদ।