কারমাইকেল কলেজ প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

এফএনএস (মমিনুল ইসলাম রিপন; রংপুর) : | প্রকাশ: ২৩ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
কারমাইকেল কলেজ প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

'উত্তরবঙ্গের অক্সফোর্ড' খ্যাত শতবর্ষী কারমাইকেল কলেজে শিক্ষার মানের অবনতি, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণে অনিয়ম, বিভিন্ন খাতে আর্থিক দুর্নীতি, অবকাঠামোগত উন্নয়নে প্রশাসনের উদাসীনতা এবং শিক্ষার্থীদের দেওয়া ৩৭ দফা দাবির বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন কলেজের শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১টায় কলেজের প্রধান ফটকের সামনে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের কাছে নানা সমস্যা তুলে ধরলেও কার্যকর কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। ফলে বাধ্য হয়ে তারা জনসম্মুখে বিষয়গুলো তুলে ধরছেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মুহাফিজ মোস্তফা ও আরবি ও ইসলামী শিক্ষা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হক মাসুম।

উচ্চমাধ্যমিকে ফরম পূরণ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ: শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, উচ্চমাধ্যমিক টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরে অর্থের বিনিময়ে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়।

তাদের দাবি, প্রথমে এক থেকে দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ১০০ টাকা এবং তিন বিষয়ে অকৃতকার্যদের ১৫০ টাকা ফি দিয়ে পুনরায় টেস্ট পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু এর বাইরে অনেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে আরও দাবি করা হয়, কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করিয়েই উপস্থিত দেখিয়ে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। খাতা দেখতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা তা দেখাতে পারেননি বলেও অভিযোগ করেন তারা। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, কলেজ প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনটির বেশি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের বোর্ড পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ না থাকলেও চার, পাঁচ ও ছয় বিষয়ে অকৃতকার্য কয়েকজন শিক্ষার্থী এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।

তাদের অভিযোগ, এ ধরনের ফরম পূরণে প্রতিজনের কাছ থেকে প্রায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। এ কাজে কলেজের একজন কম্পিউটার অপারেটরের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, তার কাছে স্ক্রিনশট ও অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। তবে ওই কর্মচারী অধ্যক্ষ ও উচ্চমাধ্যমিক কমিটির আহ্বায়কের অনুমতি ছাড়া কিছু করেননি বলে দাবি করেছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, অন্তত ৪৩ জন শিক্ষার্থী এবার ফরম পূরণের সুযোগ পাননি। অথচ অর্থের বিনিময়ে অন্যরা সেই সুযোগ পেয়েছেন বলে তারা দাবি করেন।

শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষ:

শিক্ষার্থীরা বলেন, গত বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ৯৬৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৬৫ জন অকৃতকার্য হয়েছেন। তাদের মতে, নিয়মিত মানসম্মত ক্লাস না হওয়া, শ্রেণিকক্ষ সংকট এবং দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণে ফলাফলের ধারাবাহিক অবনতি ঘটছে। তারা আধুনিক ও ইন্টারেক্টিভ শ্রেণিকক্ষ চালু, পাঠদানের মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

অনার্স-মাস্টার্সে শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক সংকট:

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে পর্যাপ্ত ক্লাস হয় না। বছরে বিভিন্ন পরীক্ষার কারণে পাঠদান বিঘ্নিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে ১৫০ আসনের কক্ষে ২৩০ জন শিক্ষার্থীকে ক্লাস করতে হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এত বড় কলেজে একটি আধুনিক মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষও নেই। ক্লাস মনিটরিং টিম গঠন করা হলেও তা কার্যকর নয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও প্রস্তাব বারবার জানানো হলেও প্রশাসন শুধু আশ্বাস দিয়ে সময় পার করছে।

৩৭ দফা দাবির অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি:

শিক্ষার্থীরা জানান, কলেজ উন্নয়নে তারা ৩৭ দফা দাবি উত্থাপন করেছিলেন। এর মধ্যে ১২টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং ২৫টি কলেজ প্রশাসনের দায়িত্বাধীন।

তাদের দাবি, ২০২৫ সালে গেট ও শিক্ষকসংক্রান্ত কয়েকটি বিষয়ে অগ্রগতি হলেও কলেজ প্রশাসনের অধীন ২৫টি দাবির একটিও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।এছাড়া ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব ও সায়েন্স ক্লাব প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।

বিভিন্ন খাতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ: 

সংবাদ সম্মেলনে কলেজের বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- ঘাস কাটার নামে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ। লাইব্রেরি খাতে প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও নতুন ও প্রয়োজনীয় বইয়ের সংকট।

ক্রীড়া খাতে প্রতিবছর প্রায় ১৮ লাখ টাকা আদায় হলেও নিয়মিত খেলাধুলার আয়োজন না হওয়া। কর্মচারী খাতে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় হলেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের অভিযোগ। দরিদ্র তহবিল থেকে প্রকৃত অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ। পাঁচটি বাস থেকে বছরে প্রায় ৯২ লাখ টাকা আদায় হলেও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন। আইসিটি খাতে অর্থ আদায় হলেও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকা। ২০১৩ সালে পাওয়া ১০৪টি কম্পিউটারের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৪০টি সচল থাকার দাবি। এছাড়াও 'শতাব্দী মঞ্চ' নির্মাণের জন্য অর্থ আদায় অব্যাহত থাকলেও দৃশ্যমান উন্নয়ন না হওয়া। কলেজের অভ্যন্তরীণ সড়কের বেহাল অবস্থা এবং পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়নে অতিরিক্ত ফি নির্ধারণের অভিযোগও করেন শিক্ষার্থীরা।

নিরাপত্তা ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে: 

শিক্ষার্থীদের দাবি, তাদের ৩৭ দফা দাবিসংবলিত ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হলেও দায়ীদের শনাক্ত করা যায়নি, কারণ প্রধান ফটকের সিসিটিভি দীর্ঘদিন ধরে অচল। বিষয়টি একাধিকবার জানানো হলেও নতুন সিসিটিভি স্থাপনে প্রশাসন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। এদিকে সংবাদ সম্মেলন থেকে কলেজ প্রশাসনকে আগামী ২৮ জুলাই সকাল ১১টার মধ্যে উত্থাপিত সমস্যাগুলোর সমাধানে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশের আল্টিমেটাম দেন শিক্ষার্থীরা।

তারা বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর রোডম্যাপ ঘোষণা না করা হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। সংবাদ সম্মেলনে হাফিজুল ইসলাম (মার্কেটিং বিভাগ), সুলতানুর রিফাত (আরবি ও ইসলামী শিক্ষা বিভাগ), রবিউল ইসলাম (গণিত বিভাগ), তারিকুল ইসলাম (ইসলাম শিক্ষা বিভাগ), মহসিন আহমেদ (দর্শন বিভাগ), লোকমান হাকিম (ইতিহাস বিভাগ)সহ শতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে