বাংলাদেশে ব্যবহৃত প্যারাকুয়েটসহ অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক অবিলম্বে নিষিদ্ধ করে নিরাপদ খাদ্য, জনস্বাস্থ্য ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন কৃষক-কৃষানী, গবেষক, মৎস্যজীবী, যুব সংগঠক ও পরিবেশকর্মীরা। তাদের মতে, পৃথিবীর প্রায় ৭০ টি দেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত প্যারাকুয়েট বাংলাদেশে এখনও অবাধে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) রাজশাহীর পবা উপজেলার কর্ণহার বিল এলাকায় উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম এবং গ্রীণ কোয়ালিশন-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনে এই দাবি জানানো হয়। কর্মসূচিতে কৃষক-কৃষাণি, মৎস্যজীবী, কৃষিবিদ, যুব প্রতিনিধি, পরিবেশকর্মী ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন।বক্তারা বলেন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির নামে অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার আজ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য এক নীরব সংকটে পরিণত হয়েছে। প্যারাকুয়েটসহ অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় মাছ, মৌমাছি, পরাগায়নকারী পতঙ্গ, মাটির অণুজীব এবং জলজ ও স্থলজ প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। এর ফলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের স্বাস্থ্য এবং দেশের খাদ্যব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ছে।বক্তারা উল্লেখ করেন, প্যান এশিয়া প্যাসিফিক-এর ২০২৫ সালের গবেষণায় বাংলাদেশসহ চারটি এশীয় দেশে ব্যবহৃত ৯৬টি কীটনাশকের মধ্যে ৫৩টিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব খাদ্য সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে এসব কীটনাশক পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার এবং নিরাপদ বিকল্প কৃষি ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সুপারিশ করে আসছে। বাংলাদেশ রটারডাম কনভেনশন ও স্টকহোম কনভেনশন এর সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দায় বহন করে।মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, প্যারাকুয়েট নিষিদ্ধ করা কৃষির বিরুদ্ধে অবস্থান নয়; বরং কৃষক, ভোক্তা ও পরিবেশের পক্ষে একটি বৈজ্ঞানিক ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত। কৃষকদের নিরাপদ বিকল্প প্রযুক্তি, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, জৈব বালাই ব্যবস্থাপনা এবং এগ্রোইকোলজি ভিত্তিক কৃষি চর্চায় সরকারি বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও বাজার সহায়তা বৃদ্ধি ছাড়া নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী মৎস্যজীবী, কৃষক ও গবেষকরা বলেন, অতিরিক্ত কীটনাশকের কারণে দেশীয় মাছ বৈচিত্র্য, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাদ্যবৈচিত্র্য, পরাগায়নকারী প্রাণী এবং কৃষি-প্রতিবেশব্যবস্থা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই সংকট কেবল পরিবেশগত নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি এবং গ্রামীণ জীবিকারও সংকট।মানববন্ধন থেকে প্যারাকুয়েটসহ বিশ্ব খাদ্য সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী সব অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক পর্যায়ক্রমে নিষিদ্ধ করা; নিবন্ধিত সব কীটনাশকের বৈজ্ঞানিক পুনর্মূল্যায়ন; খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষার জাতীয় কর্মসূচি জোরদার; কৃষকদের জন্য নিরাপদ বিকল্প প্রযুক্তিতে ভর্তুকি ও প্রশিক্ষণ; মৌমাছি ও পরাগায়নকারী প্রাণী সংরক্ষণ; জাতীয় বিষক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু; এবং জাতীয় এগ্রোইকোলজি রূপান্তর কর্মসূচি গ্রহনের জোর দাবি জানানো হয়।বক্তারা আরো বলেন, “প্যারাকুয়েট নিষিদ্ধের দাবি কোনো একক সংগঠনের দাবি নয়; এটি দেশের মানুষের জীবন, নিরাপদ খাদ্যের অধিকার, কৃষকের স্বাস্থ্য, পরিবেশ-প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জাতীয় দাবি।” তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, “প্যারাকুয়েটসহ অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিষিদ্ধে দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কৃষকদের জন্য নিরাপদ বিকল্প নিশ্চিত এবং এগ্রোইকোলজিকে জাতীয় কৃষি উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করার।” তাদের মতে, কীটনাশক ও রাসায়নিক নির্ভর কৃষি নয়, বরং এগ্রোইকোলজিভিত্তিক কৃষিই নিরাপদ খাদ্য, কৃষকের ন্যায্য অধিকার, প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।