তানোরে চোরা গোপ্তাভাবে

‘কাজি’ পরিচয়ে রাব্বানীর বিয়ে-তালাক রেজিস্ট্রি বাণিজ্য বেপরোয়া

মো: ইমরান হোসাইন; তানোর, রাজশাহী | প্রকাশ: ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৪২ এএম
‘কাজি’ পরিচয়ে রাব্বানীর বিয়ে-তালাক রেজিস্ট্রি বাণিজ্য বেপরোয়া
রাজশাহীর তানোরে এক ব্যক্তি ‘কাজি’ পরিচয়ে বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রি করে বহু বছর ধরে অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। নামসর্বস্ব এমন কাজির ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হচ্ছেন বহু মানুষ। নাম তার গোলাম রাব্বানী ধুলু। তিনি রাজশাহীর তানোর উপজেলার কলমা ইউপির রামনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা। পিতা মৃত মোজাফ্ফর হোসেন। এই নামসর্বস্ব কাজির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে কলমা ইউপিতে সরকার নিয়োগপ্রাপ্ত নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার (কাজি) মো. আহসান হাবিব বাদী হয়ে ১৩ এপ্রিল রাজশাহী জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরবার লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে অভিযোগের ৮ দিন পরও কোন কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার কলমা ইউনিয়ন এলাকায় সরকারি ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কাজি মো. আহসান হাবিব। তার পিতার নাম মো. আতাউর রহমান। বাড়ি বিল্লী গ্রামে। এরআগে থেকেই গোলাম রাব্বানী ধুলু নামের এক প্রতারক ওই এলাকার নিয়োগপ্রাপ্ত কাজি পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করে অসংখ্য বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রি করে আসছেন। সম্প্রতি ৩ এপ্রিল স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাকের নোটিশ প্রদান করেন তিনি। তার স্বাক্ষরে তালাকের এই নোটিশ প্রদান করা হয়। এমন নোটিশে কি আইনগত বৈধতা রয়েছে বলে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। রাজশাহী ডিআর অফিস কেউ বিষয় সম্পর্কে অবগত করা হয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। জানা গেছে, তালাক প্রদানকারী ওই স্ত্রীর নাম মুনুয়ারা বেগম। তার পিতার নাম মো. মহিউদ্দিন। মাতা মোসা. ফাতেমা। স্থায়ী ঠিকানা চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার সদর থানা এলাকার নয়া গলাহাট জামতলা পীরপুকুর গ্রামে। গত ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি ২০ হাজার টাকা দেনমোহর ধার্য্যে ইসলমী শরীয়াহ মোতাবেক রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার কলমা ইউপির কুমড়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রশিদ বিয়ে করেন। এরপর মুনুয়ারা বেগম স্বামী আব্দুর রশিদ চিরুরগ্ন ও পুরুষত্বহীন কারণ উল্লেখ করে ৩ এপ্রিল তালাক নোটিশ দেন। ওই তালাকের নোটিশ প্রদান করেন কাজি পরিচয়কারী গোলাম রাব্বানী ধুলু। নোটিশ প্রদানে ৩ হাজার টাকা নেন। এরপর নোটিশও দেন তিনি। নিজ গ্রামে ফার্মেসী ব্যবসার আড়ালে কাজি সেজে ২০০২ সাল থেকে নিয়মিত বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রি করছেন গোলাম রাব্বানী ধুলু। এজন্য তার রয়েছে বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রার সরকার নির্ধারিত বালাম বইও। তবে সেটা সঠিক নয়, ভুয়া। নেই আইনগত কোনো বৈধতাও। সেই সাথে কাজির নেই সরকারি নিবন্ধনও। তবুও কথিত কাজি পরিচয়েই বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রি করে বছরের পর বছর ধরে কামাচ্ছেন বিপুল পরিমান অবৈধ অর্থ। এতে ওই এলাকায় নিকাহ ও তালাক নিবন্ধনে অনিশ্চয়তায় এক প্রকার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে লাগামহীন ভাবে বেড়েই চলেছে তার দৌরাত্ম্য। বিয়ে ও তালাক নিবন্ধনেও তার জালিয়াতি চোরা গোপ্তাভাবে বেশ বেড়েছে। কথিত এই কাজির ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। ভুয়া বিয়ে ও তালাকে নিঃস্ব হচ্ছে নারী-পুরুষ উভয়েই। চলতি বছরের ৩ এপ্রিল এমনই এক ঘটনা ঘটে। এছাড়াও এই কাজি পরিচয়কারী ব্যক্তি নিকাহ্নামা রেজিস্ট্রির সত্যায়িত অনুলিপি প্রদান করছেন। বিয়ে বা তালাক রেজিস্ট্রি খরচের নামে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন। সম্প্রতি গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর এরশাদ আলী ও জায়েদা বেগম নামের বর ও কনের নিকাহ্নামা রেজিস্ট্রি অনুলিপি থেকে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের উভয়ের বাড়ি তানোর উপজেলার ভালুকাকান্দর গ্রামে। ভুয়া কাজিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রাজশাহী জজকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনোয়ার হোসেন বাবু বলেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার জন্য একজন কাজি নিয়োগ দেবার বিধান রয়েছে। কিন্তু ‘অবৈধ ও ভুয়া বিয়ে এবং তালাক নিবন্ধনের দায়ে ওই কাজির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ দণ্ডবিধিতে আছে। দণ্ডবিধির ৪১৭ ধারা অনুযায়ী কাজির এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। নিবন্ধিত না হয়েও বৈধ কাজির রূপ ধারণ করে কাজ করা প্রতারণার সামিল। অপরদিকে মুসলিম বিয়ে ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন-১৯৭৪ অনুযায়ী অনুর্ধ দুই বছর পর্যন্ত সাজা হতে পারে। এবিষয়ে গোলাম রাব্বানী ধুলু বলেন, আমি গত ২০০২ সালে সংশ্লিষ্ট আইন মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগ পেয়েছি। তার নিয়োগ সম্পর্কে ডিআর অফিসও অবগত আছেন। এজন্য নিয়মিত বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রি করে আসছেন। বর্তমানে বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রির জন্য কোথাও যাওয়া হয় না। কেউ যদি বাড়িতে আসেন সেক্ষেত্রে বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রি করেন। তবে, একই ইউনিয়নে দুইজন কাজি কি সরকার নিয়োগ দেয় জানতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন তিনি । এনিয়ে তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নাঈমা খানের সরকারি মোবাইলে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও রিসিভ হয়নি। পরে রাজশাহী জেলা প্রশাসক (ডিসি) কাজী শহিদুল ইসলামকে ফোন দেয়া হলে তিনি বলেন, এমন অভিযোগ ব্যাপারে তিনি অবগত নন। তবে, অভিযোগ হয়ে থাকলে তার কাছে অবশ্যই আসবে। তখন তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি। 
আপনার জেলার সংবাদ পড়তে